ছােট অভ্যাস বড় সাফল্য

Table of Contents

আমার গল্প

 

 

স্কুলজীবনের শেষদিনে সােফমাের উচ্চ বিদ্যালয়ে, একটি বেসবল ব্যাটের দ্বারাআঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলাম আমি। আমার বন্ধু একটি ফুলসুইং বলকে পুরোদমে মারতেচেয়েছিল। হঠাৎ ব্যাটটি তার হাত থেকে পিছলে গেল এবং সেটি সরাসরি আমারদিকেই উড়ে আসল।

ব্যাটটা আমার চোখ এবং নাকের মাঝেখানটাতে আঘাত করে বসল। আমিচোখে অন্ধকার দেখলাম। তারপর সেই মুহুর্ত থেকে আর কোনাে কিছু মনে ছিল না।ব্যাট আমার মুখে এমন জোরে আঘাত করেছিল যে, নাকটি ভেঙ্গে গেল। তারপরসেটি একটি বিকৃত ইউ-আকার নিয়ে নিল। আঘাতটি আমার মাথার খুলির ভিতরেপৌছে গিয়েছিল এবং সেখানকার টিস্যুকে পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ করে তুলেছিল। যার ফলে
ততক্ষনাৎ মাথাটা ফুলে উঠল। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমি একটি ভাঙা নাক,একটি ফুলে উঠা মাথার খুলি এবং দুটি আঘাতপ্রাপ্ত চোখ উপহার পেয়ে গেলাম।

যখন চোখ খুললাম, তখন কিছু লােককে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে
দেখলাম। আর কিছু লােককে দৌড়ে আসতে দেখলাম আমাকে সাহায্য করার জন্য।নীচে তাকিয়ে দেখতে পেলাম আমার জামাতে লাল লাল রক্তের দাগ। এক সহপাঠীআমার পরিহিত শার্টটিকে পিছন দিক থেকে নামিয়ে হাতে দিয়ে দিয়ে দিল। সেটিকেআমি ভাঙ্গা নাক থেকে ছুটে আসা রক্তের স্রোত রােধ করতে ব্যবহার করলাম। এসবদেখে আমি হতবাক এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তখনও জানতাম না যে আমার
আঘাতটা কতটা সিরিয়াস।

আমার শিক্ষক কাঁধের চারপাশে তার হাতটিকে লুপের মতাে করে নিয়ে
আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর আমরা নার্সের অফিসের দিকে দীর্ঘ পথ হাটতেশুরু করে দিলাম। স্কুলকে পিছনে ফেলে পাহাড়ের নীচের মাঠটি অতিক্রম করেগেলাম। এলােমেলাে অনেকগুলাে হাত আমাকে স্পর্শ করে ছিল তখন। তারা যেআমাকে সােজা করে ধরে রেখেছে সেটিও বেশ বুঝতে পারছিলাম। এদিকে সময়নিয়ে ধীরে ধীরে তারা চলতে লাগল, তাদের দ্বারা যতটা সম্ভব ততটাআরামদায়কভাবে। কিন্তু আমার জন্য প্রতিটি মিনিটের গুরুত্ব কতখানি তা তখন কেউ
বুঝতে পারেনি। আমরা নার্সের অফিসে পৌঁছালে, তিনি আমাকে কয়েকটি প্রশ্নজিজ্ঞাসা করলেন।

 

 

আমেরিকার রাস্ট্র পতি কে

 

বিল ক্লিনটন”, আমি বলেছিলাম। কিন্তু সঠিক উত্তরটি ছিল জর্জ ডব্লিউ বুশ।“তােমার মায়ের নাম কি?“উহ। উম।” আমি থামলাম। দশ সেকেন্ড কেটে গেল।প্যাটি”, সবকিছু উপেক্ষা করে আকস্মিকভাবে নিজের মায়ের নাম মনেকরতে আমার দশ সেকেন্ড লেগে গেল।

মনে পড়ে, এটাই আমাকে করা শেষ প্রশ্ন ছিল। আমি শরীর নাড়াতে
পারছিলাম না। মস্তিস্কে সেভাবে দ্রুত তথ্য চলাচলও করতে পারছিল না। আরঅ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই আবার হুঁশ হারিয়ে ফেললাম। কয়েক মিনিট পরে, স্কুলথেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলাে স্থানীয় হাসপাতালে।

সেখানে আসার অল্প সময়ের মধ্যেই শরীর অসাড় হয়ে যেতে শুরু করে
আমার। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাবার মতাে শরীরের বেসিক কিছু ফাংশন তখনওচালিয়ে যেতে পারছিলাম। তারপর আমার প্রথম একটি অস্ত্রোপচার করা হলাে। শ্বাস-প্রশ্বাস পুরােপুরি বন্ধ হয়ে যাবার মতাে অবস্থা তৈরি হয়েছিল সে সময়ে। চিকিৎসকরাতাই তাড়াতাড়ি করে অক্সিজেন সরবরাহ করতে লাগলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতেতারা একটি হেলিকপ্টার যােগে আমাকে সিনসিনাটির বড় হাসপাতালে স্থানান্তরকরার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তারপর আমাকে ইমার্জেন্সি রুম থেকে জরুরী ভিত্তিতে বের করে দেওয়াহলাে। বহনকারী স্ট্রেচারটিকে হেলিপ্যাডের রাস্তাজুড়ে একগুঁয়ে ভাবে নিয়ে যাওয়াহচ্ছিল। একজন নার্স সেটাকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন এবং অন্য একজন আমার প্রতি লক্ষ্যরাখছিল; যাতে আমার কোনাে সমস্যা না হয়। আমার মা, যিনি কয়েক মুহুর্ত আগেহাসপাতালে এসেছেন, হেলিকপ্টারে আমার পাশে উঠে বসলেন। আমি তখন অজ্ঞান
হয়ে ছিলাম। শ্বাস নিতে পারছিলাম না। ফ্লাইটের পুরােটা সময় তিনি আমার হাতধরে ছিলেন এবং আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছিলেন।

মা আমার সাথে আসার সময় বাবা বাড়ি চলে গেলেন আমার ভাই এবং
বােনকে সামলে রাখতে। তাদের কাছে আমার অসুস্থতার সংবাদটি পৌছে দিতে।তিনি আমার বােনকে অপূর্ণ চোখে বােঝালেন যে, তিনি যদি না আসতেন তাহলেহয়তাে বােনের অষ্টম শ্রেণি পাশের রাতের অনুষ্ঠানটিকে মিস করতে হতো। তারপরঅনুষ্ঠান শেষ করে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে তাদেরকে ছেড়ে তিনি মায়ের সাথেদেখা করতে সিনসিনাটিতে চলে আসেন।

মা ও আমি যখন হাসপাতালের ছাদের হেলিপ্যাডে নামলাম তখন প্রায় বিশজন চিকিৎসক ও নার্সের একটি দল দৌড়ে এলেন। আমাকে তারা ট্রমা ইউনিটেরকাছে হস্তান্তর করলেন। ততক্ষণে আমার মস্তিস্কের ফোলাভাব মারাত্মক হয়েগিয়েছিল। বার বার ট্রমাজনিত সমস্যা হচ্ছিল। ভাঙা হাড়গুলােকে ঠিক করার দরকারছিল। তবে অস্ত্রপচার করার মতাে অবস্থায় সে সময় আমি ছিলাম না। এজন্য

তিনদিন পর অস্ত্রপচার করা হয়। তারপর আমি কোমায় চলে যাই এবং ভেন্টিলেটরেনেয়া হয় আমাকে।বাবা-মা এখানে অপরিচিত ছিলেন না। দশ বছর পূর্বে একই বিল্ডিংয়ের গ্রাউন্ডফ্লোরে তারা ভর্তি হয়েছিলেন। ঠিক যখন আমার বােন তিন বছর বয়সে লিউকেমিয়ারােগে আক্রান্ত হয় তখন। সেই সময় আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর এবং ছােটভাইয়েরবয়স ছিল মাত্র ছয় মাস। সেখানে আমার বােনের আড়াই বছরের কেমােথেরাপিট্রিটমেন্ট চলতে থাকে। মেরুদণ্ডের ট্যাপ এবং অস্থি মজ্জার বায়ােপসিগুলাে ঠিক হবার

পরে ছােট বােন অবশেষে সুখী, স্বাস্থ্যবান এবং ক্যান্সারমুক্ত হয়ে হাসপাতালের বাইরেচলে আসে। দশ বছরের সাধারণ জীবন যাপনেরপরে এখন তারা আবার একইজায়গায় এসে পৌঁছে গেছেন তাদের অন্য আর এক সন্তানকে সাথে নিয়ে।যখন আমি কোমায় চলে গেলাম, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন পুরােহিতএবং একজন সামাজিক কর্মীকে পাঠিয়েছিল আমার বাবা-মা কে সান্ত্বনা দেবার জন্য।ইনি ছিলেন সেই একই পুরােহিত, যার সাথে তাদের এক দশক আগে দেখাহয়েছিল। ঠিক যখন তারা আমার ক্যান্সার আক্রান্ত বােনকে নিয়ে এখানে আসেনতখন।

আস্তে আস্তে দিন রাতে গড়াতে লাগল। আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে একের পরএক মেশিন সাপাের্ট দেয়া হলাে। হাসপাতালের গদিতে বাবা-মা নিদ্রাহীনভাবে রাতকাটালেন। প্রতিটি মুহুর্ত দুশ্চিন্তায় কেটে যাচ্ছিল। পরে দুশ্চিন্তার কারণে পুরােপুরিজেগেই রইলেন তারা। মা পরে বলতেন যে, সেটি নাকি তার জীবনের সবচেয়েখারাপ ও দীর্ঘ রাত ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.