মেদ ভুড়ি কমানোর উপায়।

মেদ ভুড়ি কমানোর উপায়

 

নিদান—নিরন্তর শ্লেষ্মজনক দ্রব্য ভােজন করিলে,অথবা ব্যায়ামানি কোনরূপ পরিশ্রম না করিলে, কিংবা দিবানিদ্রা বশতঃ ভুক্ত দ্রব্য সমগ্রূপে পরিপাক হইতে না পারিলে, মধুররসযুক্ত অপরসে পরিণত হয়। সেই রসের স্নেহভাগ হইতে মেদ পদার্থের বৃদ্ধি হইয়া মেদোরােগ উৎপন্ন হয়। সেই রােগে মেদোবৃদ্ধি জন্য বরক্তাদিবাহী স্রোতঃসমূহ রুদ্ধ হইয়া যায়,

করোনার লক্ষণ গুলো কি কি।

সুতরাং অন্যান্য ধাতুর পুষ্টি হইতে পারে না; কেবল মেদোধাতুই ক্রমশঃ বর্ধিত হইয়া মনুষ্যকে অতি সূল ও সৰ্ব্বকাৰ্য্যে অসমর্থ করিয়া তুলে। ক্ষুদ্রশ্বাস, তৃষ্ণা, মুচ্ছা, অধিক নিদ্রা, হঠাৎ উচ্ছাসের অবরােধ, অবসন্নতা, অতিশয় ক্ষুধা, ঘৰ্ম্মনিগম, শরীরের দুর্গন্ধ, এবং বল ও মৈথুনশক্তি হ্রাস, এই কয়েকটী মেদোরােগের অনু- যঙ্গিক লক্ষণ।

 

মেদোবৃদ্ধির পরিণাম-ফল-মেদেধাতু অতিশয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইলে, বাতাদি-দোসমুহ কুপিত হইয়া সহসা প্রমেহপিড়কা, সুর ও ভগন্দর প্রভৃতি উৎকট পীড়া উৎপাদন করিতে পারে। ঐ পীড়া উপস্থিত হইলে, মেদোরােগীর প্রাণনাশের সম্ভাবনা।

 

চিকিৎসা—যেসকল কাৰ্য্যদ্বারা শরীর কৃশ ও রুক্ষ হইতে পারে, তাহারই আচরণ করা নেদেরােগের প্রধান চিকিৎসা। প্রত্যহ প্রাতঃকালে মধুমিশ্রিত জল পান করাইলে, মেদোরােগের উপশম হয়। ত্রিফলা ও বিকটুচুর্ণ, তৈল ও লবণ-মিশ্রিত করিয়া দীর্ঘকাল সেবন কইলে, মেদোরােগ প্রশমিত হয়। অথবা বিড়ঙ্গ, শুঠ, সবার, কালৌহভস্ম, যব ও আমলকী, ইহাদের সমভাগ চূর্ণ মধুর সহিত সেবন করাইবে।

 

গণিয়ারীর রস বা শিলাজ সেবনেও মেদোয়ােগে বিশেষ উপকার দর্শে। অমৃতাদি-গুগগুলু ও নবক-গুগুলু, ক্রষণাস্থলৌহ, বড়বাগিলৌহ, বড়বাগ্নিরস, এবং ত্রিফলা তৈল প্রভৃতি, ঔষধাদি মেটোরােগের নিবারণজন্য প্রয়োগ করা আবশ্যক। মহামুগন্ধি নামক তৈল, অথবা প্রসিদ্ধ সুগন্ধি দ্রব্যসমুহ গাত্রে লেপন করিলে, মেদোজন্য দুর্গন্ধ সম্পূর্ণরূপে নিবারিত হইয়া থাকে।

 

পথ্যাপথ্য-দিবসে শ্যামাতলের অন্ন, অভাবে অতিসূক্ষ্ম পুরাতন চাউলের অন্ন, ক্ষুদ্র মৎস্যের ঝােল, ডুমুর, কঁচকলা, মােচা, বেগুন, পটোল ও পুরাতন কুন্মাণ্ডের তরকারী এবং পাতি বা কাগজীনেবু। রাত্রিকালে যবের আটার রুটী এবং পূর্বোক্ত সমস্ত তরকারী ব্যবস্থয়। মিষ্টদ্রব্যের মধ্যে কেবল অল্প মিছরি। স্নান নিষিদ্ধ ; অসহ্ন হইলে গরম জল শীতল করিয়া সেই জলে স্নান এবং গরম জলই পান ব্যবস্থেয়। পরিশ্রম, চিন্তা, পথপৰ্যটন, রাত্রিজাগরণ, ব্যায়াম ও মৈথুন, এই সমস্ত কাৰ্য্য মেদোরােগে বিশেষ উপকারক।

 

নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম—যাবতীয় কফবৰ্ধক ও স্নিগ্ধ দ্রব্য, দুষ্ট, দধি, মাখন, মাংস, মৎস্য, ঘৃতপক্কদ্রব্য, নারিকেল, পৰুকদলী এবং অন্যান্য পুষ্টিকর দ্রব্য ভােজন, সুখকর-শয্যায় শয়ন, সুনিদ্রা, দিবানিদ্রা, সর্পদ। উপবেশন, আলস্য এবং চিন্তাশূন্যতা এই রােগে অনিষ্টকারক।

 

কার্শরােগের চিকিৎসা প্রসঙ্গত: কাশবােগের বিষয়ও এই স্থানে আলােচিত হওয়া আবশ্যক। রুক্ষদ্রব্য ভেজন, অতিমাত্র পরিশ্রম, অতি- রিক্ত চিন্তা এবং অধিক স্ত্রী-সহবাস প্রভৃতি কারণে কারােগ উৎপন্ন হয়। এই রােগে মেদঃ, মাংস, প্রভৃতি সকল ধাতুই ক্ষীণ হইয়া যায়; সুতরাং রােগীও ক্রমশঃ দুৰ্বল হইতে থাকে। অশ্বগন্ধা কাশ্যরােগের একটা উৎকৃষ্ট ঔষধ।

 

দুগ্ধ, ধৃত, বা জলের সহিত অশ্বগন্ধা পাক করিয়া প্রত্যহ সেবন করাইলে, কার্শরােগে বিশেষ উপকার হয়। শুক্রতারল্য রােগে যেসকল ঔষধ কথিত হইয়াছে, তন্মধ্যে | অশ্বগন্ধা দূত ও অমৃত প্রাশ দুত এবং বাতব্যাধি কথিত ছাগলদ্যি ঘৃত প্রভৃতি পুষ্টিকর ঔষধ কাশ্যরোগে প্রয়ােগ করা আবশ্যক।

 

অশ্বগন্ধার কল্ক ১ এক সের, অশ্বগন্ধার কাথ ৬ ষােল সের এবং দুগ্ধ। যােলসের এই তিন প্রকার দ্রব্যের সহিত তিলতৈল /৪ চারি সের যথাবিধি পাক করিয়া মর্দন করিলেও কৃশাঙ্গ পুষ্ট হইয়া থাকে ।

 

পথ্যাপথ্য—এই রােগে গুত, দুগ্ধ, মাংস, মৎস্য এবং অন্যান্ত যাবতীয় পুষ্টিকর দ্রব্য আহার, সুনিদ্রা, দিবানিদ্রা, পরিশ্রমত্যাগ, চিন্তাশূন্যতা ও সৰ্ব্বদা হৃষ্টচিত্তে অবস্থান করা হিতকর। মাংসই কাশ্যরােগে উৎকৃষ্ট পথ্য। শুক্রতারল্য ও ধ্বজভঙ্গ-রােগােক্ত সমুদায় পথ্যাপথ্য কাশারােগে প্রতিপালন করা বিধেয়।

 

আরো পড়ুন: ব্রন কে সারা জীবনের জন্য মূক্ত করে দিন

উদররােগ

 

নিদান ও সাধারণ লক্ষণ। একমাত্র অগ্নিমান্দ্যকেই প্রায় সকল প্রকার উদর রােগের নিদান বলা যাইতে পারে। তদ্ভিন্ন অজীর্ণদোষজনক অন্ন- ভােজন এবং উদরে জলসঞ্চয়, এই দুইটীও উদররােগের প্রধান কারণ। ঐ সমস্ত কারণে সঞ্চিত বাতাদি দোষ দেবহ ও জলবহ স্রোত:সমুহকে রুদ্ধ এবং প্রাণ- বায়ু, অপানবায়ু ও অগ্নিকে দূষিত করিয়া, উদরােগ উৎপাদন করে। তদ্ভিন্ন প্লীহা ও যকৃতের অত্যন্ত বৃদ্ধি হইলে, অন্ত্রনাড়ী কোনরূপে ক্ষত হইলে এবং অমধ্যে জল সঞ্চিত হইলেও

 

উদরবােগ উৎপন্ন হইয়া থাকে। উদরাম্মান, গমনে অশক্তি, দুৰ্বলতা, অতিশয় অগ্নিমান্দ্য, শােথ, সমুদায় অঙ্গের অবসন্নতা, অধােবায়ু ও মলের অনির্গম এবং দাহ ও তন্দ্রা, এই কয়েকটী উদররােগের সাধারণ লক্ষণ। উদরবােগ ৮ আট প্রকার :-বাতজ, পিত্তজ, প্লেজ, ত্রিদোষ, প্লীহা ও যকৃৎ জনিত, মলসঞ্চয়জনিত, ক্ষয়জ ও উদরে জলসঞ্চয়জনিত।

 

বাতজ-উদর লক্ষণ—বাতজ উদররােগে হস্ত, পদ, নাভি ও কুক্ষি- দেশে শােথ ; কুক্ষি, পা, উদর, কটি, পৃষ্ঠ ও সন্ধিসমূহে বেদনা; শুককাস ; অঙ্গমর্দ ; শরীরের অধােভাগে ভাববােধ, মলবােধ, ত্বক, চক্ষুঃ ও মূত্র প্রভৃতির শাব বা অরুণবর্ণতা, অকস্মাৎ উদরশােথের হ্রাস বা বৃদ্ধি, উদরে সূচীবেধবৎ বা ভঙ্গবৎ বেদনা ও সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কৃষ্ণবর্ণ শিরাসমূহের উৎপত্তি, উদরে আঘাত করিলে, বায়ুপূর্ণ ভস্ত্রীয় আঘাত করার ন্যায় শৰোৎপত্তি ও উদরের সর্বত্র বেদনার সহিত বায়ুর সঞ্চলন, এই সমস্ত লক্ষণ প্রকাশিত হয়।

 

শরীর সুস্থ রাখার নিয়ম

পিত্ত উদর লক্ষণ—পিত্তোরে জর, মুচ্ছা, তৃষ্ণা, মুখে কটু আস্বাদ, ভ্ৰম, অতিসার, ত্বক ও চক্ষুঃ প্রভৃতির পীতবর্ণতা; এবং উদর—ঘৰ্ম্ম, দাহ, বেদনা ও উগ্নযুক্ত এবং কোমলস্পর্শ, হরিৎ, পীত বা তাম্রবর্ণের শিরাসমূহ দ্বারা আচ্ছন্ন ও উদর হইতে উদ্মা বহির্গত হওয়ার ন্যায় অনুভব,- এই সমস্ত লক্ষণ লক্ষিত হইয়া থাকে। পিত্তোদর শীঘ্রই পাকিয়া জলােদররূপে।

 

শ্লেষ্মজ-উদর লক্ষণ-প্লেয়ােদর অঙ্গের অবসন্নতা, স্পর্শজ্ঞানের অভাব, শােথ, অঙ্গের গুরুতা, নিদ্রা, বমনবেগ, অরুচি, শ্বাস, কাস ও ত্বক প্রভৃতির শুক্লবর্ণতা এবং উদর বৃহৎ, স্তিমিত, চিক্কণ, কঠিন, শীতল স্পর্শ, গুরু, অচল ও শুক্লবর্ণ-শিরাব্যাপ্ত হয়। শ্লেয়ােদর দীর্ঘকালে বর্ধিত হইয়া থাকে।

 

দূষ্য বা ত্রিদোষজ উদরােগের লক্ষণ–নখ, ললাম, মূত্র, বিষ্ঠা, আর্তব বা কোনরূপ বিষাদিদ্বারা দূষিত অন্নভােজন করিলে, রক্ত ও তাদি দোষত্ৰয় কুপিত হইয়া, ত্রিদোষজ-উদরােগ উৎপাদন করে। ইহাতে বাতাদি তিনদোষজাত উদরেরই লক্ষণসমুহ মিলিতভাবে প্রকাশিত হয়। এই রােগ পাণ্ডুবর্ণ, কৃশ, পিপাসায় শুষ্কক ও পুনঃ পুনঃ মুর্হিত হইতে থাকে। শীতল সময়ে, শীতল-বায়ুস্পর্শে এবং জলঝড়বিশিষ্ট দিবসে, এই উদর বর্ধিত ও দাহযুক্ত হয়। ইহার অপর নাম দূয়োদর।

 

প্লীহােদর ও যকৃছুদর—কজনক দ্রব্য এবং যেসকল দ্রব্যের অনুপাক হয়, সেই সমস্ত দ্রব্য নিরন্তর ভােজন করিলে, কফ ও রক্ত দূষিত হইয়া, প্লীহা বা যকৃতের বৃদ্ধিসাধন করে। প্লীহা বা যকৃৎ অতিমাত্র বদ্ধিত হইয়া, যখন উদরকেও বর্ধিত করে এবং অঙ্গের অবসন্নতা, মন্দ মন্দ জ্বর, অগ্নিমান্দ্য, বলক্ষয়, দেহের পাণ্ডুবর্ণতা ও কফপিজনিত অন্যান্য উপদ্রব উপস্থিত করে, তখন তাহাকে প্লীহােদর বা যকৃছদর কহে। প্লীহােদর উদরের বামভাগ এবং যকৃদুরে উদরের দক্ষিণ ভাগ অধিক বৃদ্ধি হইয়া থাকে। ইহাতে বায়ুর প্রকোপ ধিক থাকিলে, উদাব, আনাহ ও উদরে বেদনা ; পিত্তের প্রকোপে মােহ, তৃষ্ণা, দাহ ও অর; এবং কফের প্রকোপে গাত্রগুরুত, অরুচি ও উদরের কঠিনতা, এইসমস্ত লক্ষণ লক্ষিত হয়।

 

বদ্ধ গুদোদর—শাকাদি পিচ্ছিল ভােজ্যদ্রব্যদ্বারা অথবা অন্নাদির সহিত প্রবিষ্ট চুল কিংবা শর্করাদি পদার্থদ্বারা অন্ত্রনাড়ী নিরুদ্ধ হইলে, সম্মার্জনী- নিক্ষিপ্ত ধুলিরাশির ন্যায় মল ও দোষসমূহ গুনাড়ীতে সঞ্চিত হইয়া, বন্ধগুদোদর নামক মলসঞ্চয়জনিত উদরােগ উৎপাদন করে। ইহাতে হৃদয় ও নাভির | মধ্যবর্তী উদর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং অতি কষ্টে অল্প অল্প মল নিঃসৃত হইয়া থাকে।

 

ক্ষতজ-উদর—অন্নের সহিত কণ্টকাদি শল্য প্রবিষ্ট হইয়া যদি অন্ত্র- নাড়ীকে বিদীর্ণ করে, অথবা অতিরিক্ত ভােজন ও জম্ভাদিদ্বারা অন্ত্রনাড়ী যদি বিদীর্ণ হইয়া যায়, তাহা হইলে সেই ক্ষতস্থান হইতে জলবৎ সাব নির্গত হইয়া। নাভির অপােভাগে উদরের বৃদ্ধি সম্পাদন করে এবং গুহার দিয়া জলবৎ পদার্থ নির্গত হইতে থাকে। ইহাকে পরিস্রাবুদর নামক ক্ষতজ-উদরােগ কহে। এই | | উদয়রােগে সূচীবেধের ন্যায় বা বিদীর্ণ হওয়ার ন্যায় অত্যন্ত যাতনা হইয়া থাকে।

 

জলােদর লক্ষণ-স্নেহপান, অনুবাসন (স্নেহপদার্থদ্বারা পিচকারী ), বমন, বিরেচন, অথবা নিরূহণ ( রুক্ষপদার্থের পিচকারী) ক্রিয়ার পর হঠাৎ শীতল জল পান করিলে, কিংবা স্নেহপদার্থদ্বারা জলবহ স্রোতঃ উপলিপ্ত হইলে, সেই শ্রোতঃসমূহ দুষিত হয় এবং দূষিত নাড়ীতে জল সঞ্চিত হইয়া উদরের বৃদ্ধি করে ; ইহাকে উদকোদর বা জলেদর নামক জলসঞ্চয়জনিত উদরবােগ কহে। এই রােগে উদর চিক্কণ, বৃহৎ, জলপূর্ণের ন্যায় স্ফীত, এবং সঞ্চালিত হইলে ক্ষুব্ধ, কম্পিত ও শব্দযুক্ত হইয়া থাকে। আরও ইহাতে নাভির চতুর্দিকে বেদনাবােধ হয়।

 

সাধ্যাসাধ্যতা -উদ রগেমাত্রই স্বভাবত: কষ্টসাধ্য ; বিশেষতঃ জলােদর ও তােদর রােগ অতিশয় কষ্টসাধ্য ; অস্ত্র-চিকিৎসা ভিন্ন ইহা হইতে আরােগ্যের আশা অল্প পীড়া অধিক দিনের হইলে বা রােগীর বক্ষয় হইলে, সমুদয় উদরােগই অসাধ্য হইয়া উঠে। যে উদররােগীর চক্ষু: শােথযুক্ত, লিঙ্গ বক্র, বৃক্ পাতলা ও ক্লেদযুক্ত এবং বল, অগ্নি, রক্ত ও মাংস ক্ষীণ হইয়া যায়, অথবা যে রােগীর পার্শ্বদ্বয় ভঙ্গবৎ, অন্নে বিদ্বেষ, অতিসার কিংবা বিরেচন করা- ইলেও কোষ্ঠ পরিপূর্ণ থাকে, সেই সমস্ত উদরবােগও অসাধ্য।

 

সৰ্ববিধ উদরােগের চিকিৎসা–প্রায় সকল প্রকার উদর- রােগেই বাতাদি তিন দোষ কুপিত হয় ; এইজন্য বাতাদি তিন দোষেরই শান্তি- কারক চিকিৎসা কর্তব্য। ইহাতে অগ্নিবৃদ্ধির জন্য অগ্নিবর্ধক ঔষধ এবং বিরেচন জন্য উষ্ণদুগ্ধ বা গােমূত্রের সহিত এরওতৈল পান করান আবশ্যক। বাতাদরে প্রথমতঃ পুরাতন ঘৃতাদি স্নেহপদার্থ মালিশ করিয়া স্বেদ দিতে হয় ; তৎপরে বিরেচন করাইয়া, বস্ত্রখণ্ডদ্বারা উদববন্ধন করিয়া রাখিৰে। বাতােদরে পিপুল ও সৈন্ধব লবণের সহিত ; পিত্তোদরে চিনি ও মরিচের সহিত ; শ্লেষ্মােদরে

 

যমানী, সৈন্ধব লবণ, জিরা ও ত্ৰিকটু সহিত এবং সন্নিপাতােদরে বিকটু, যক্ষার ও সৈন্ধব-লবণের সহিত ঘােল পান করাইবে তাহারা দেহের ভার ও অরুচি বিনষ্ট হয়। প্লীহােদরে ও যদুদরে প্লীহা ও যকৃৎরােগােক্ত চিকিৎসা করিতে হইবে। বন্ধোদরে প্রথম ও স্বেদ দিয়া তীক্ষ্ণবিরেচন করান আবশ্যক দেবদারু, শজিনা ও আপা, এই সকল দ্রব্য, অথবা অশ্বগন্ধা, গােমূত্রসহ পেষণ করিয়া, পান করাইলে, দূদ্যোর প্রভৃতি সৰ্ব্ব- প্রকার উদবেগ নিবারিত হইয়া থাকে।

 

প্রাতঃকালে মহিষের মুত্র এক ছটাক আন্দাজ পান করাইলে, সর্বপ্রকার উদরােগ প্রশমিত হয়। পুনর্নবা, দেবদারু, গুলঞ্চ, আকনাদি, বিল, গাের, বৃহতী, কণ্টকারী, হরিদ্রা, দারিদ্রা, পিপুল, চিতামুল ও বাসক, এই সকল দ্রব্যের সমভাগ চূর্ণ গােমূত্রের সহিত সেবন করাইলেও সর্বপ্রকার উদরােগ প্রশমিত হয়। দেবদারু, শুঠ গুলঞ্চ, পুনর্নবা ও হরীতকী, ইহাদের কাথ সেবা জলােদর, শােথ, শ্রীপদ, গলগণ্ড ও বাতরােগ নিবারিত হয়। প্রমলব, ছাল, পটোলপত্র, শুঠ, কটকী, গুলঞ্চ, দেবদারু ও হরীতকী, ইহাদের কষা পান করাইলে, সৰ্ব্বপ্রকার উদর, সৰ্বাঙ্গশােখ, কাস, শূল, শ্বাস ও পাণ্ডুরােগের উপশম হইয়া থাকে।

 

উদরােগে দোষবিশেষ বিবেচনা করিয়া, পুনর্নবাসি কাথ, কুষ্ঠাদিচুর্ণ, সামুদ্রাচূর্ণ, নারায়ণ চূর্ণ, ত্রৈলােক্যসুন্দর রস, ইচ্ছাভেদী রস, নারাচরস, পিপ্পলথলৌহ, শােথােটরারিলৌহ, চিত্রকত, মহাবিদ্যত, বৃহৎ নারাচদ্বত ও রসায়ন-তৈল প্রভৃতি ঔষধ প্রয়ােগ করা আবশ্যক। রােগী দুৰ্বল হইলেকোন তীক্ষ বিরেচক ঔষধ না দিয়া, মৃদুবিরেচক ঔষধ প্রয়ােগ করিবে।

 

পথ্যাপথ্য–উদরবােগে লঘুপাক ও অগ্নিবৃদ্ধিকারক পথ্য ব্যবস্থায়। পীড়ার প্রবল অবস্থায় কেবল মাণমণ্ড, অভাবে সহমত কেবল দুগ্ধ অথবা দুগ্নসাগু প্রভৃতি

 

পীড়া অধিক প্রবল না থাকিলে, দিবসে পুরাতন সূক্ষ্ম চাউলের অন্ন, মুগের দালের যুষ, পটোল, বেগুন, ডুমুর, ওল, মাণকচু, শজিনার ডাটা, কাকরােল, ক্ষুদ্র মূলা, শ্বেতপুনর্নবা ও আদা প্রভৃতির তরকারী, অল্প সৈন্ধব ঝণে পাক করিয়া ভােজন করিতে দেওয়া যায়। রাত্রিকালে দুগ্ধ-সাগু অথবা অধিক ক্ষুধা থাকিলে অল্প পরিমাণে পাতলা রুটী । জল পান একেবারে পরিত্যাগ করিয়া দুগ্ধদ্বারা তৃষ্ণা নিবারণ করা আবশ্যক; কিন্তু নিতান্ত প্রয়ােজন হইলে গরম জল পান করিতে দেওয়া যায়।

 

নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম —পিষ্টকাদি গুরুপাক দ্রব্য, তিল, লবণ ও শিম প্রভৃতি দ্রব্য ভােজন এবং স্নান, দিবানিদ্রা ও পরিশ্রম প্রভৃতি উদরোগে বিশেৰ অনিষ্টকারক।

 

অন্য পোস্ট: ক্রিমিরোগ থেকে বাচার উপাই

শােথরােগ

 

নিদান ও সাধারণ লক্ষণ –বমন-বিরেচনাদি শুদ্ধিক্রিয়া, জ্বর, অতিসার, গ্রহণী, পাণ্ডু, অর্শ, রক্তপিত্ত, প্লীহা ও যকৃৎ প্রভৃতি পীড়া, এবং উপবাস ও বিষমভােজনাদি দ্বারা কৃণ ও দুর্বল হওয়ার পরে ক্ষার, অন্ন, তীক্ষ, উষ্ণ ও গুরুপাক দ্রব্য ভােজন করিলে, অথবা দধি, অপদ্রব্য, মৃত্তিকা, শাক, ক্ষীরমৎস্যাদি সংযােগবিরুদ্ধ ও বিষমিশ্রিত দ্রব্য ভােজন করিলে এবং বমন বিরেচনাদি করাইর উপযুক্ত কালে তাহা না করাইলে বা অযথারূপে তাহা সম্পাদিত হইলে, পরিশ্রন ত্যাগ করিলে, গর্ভাব হইলে কিংবা মৰ্ম্মস্থানে আঘাত পাইলে, শােথবােগ জন্মে।

 

কুপিত বায়ু—দুষ্ট-বক্ত, পিত্ত ও কফকে বহিঃস্থ শিরাসমূহে আনয়ন করিয়া এবং নিজেও সেই সমস্ত দোষদ্বারা রুদ্ধগতি হইয়া ত্বক ও মাংসের উচ্চতা সম্পাদন করে; ইহারই নাম শােথরােগ। শােথ জন্মিবার পূর্বে সন্তাপ, শিরাসমূহ বিস্তৃত হওয়ার ন্যায় যাতনা ও অঙ্গে ভারবােপ, এই সমস্ত পূৰ্বরূপ প্রকাশিত হয়; অবয়ববিশেষের স্ফীততা, সেইস্থানে ভারব, চিকিৎসা ব্যতীতও কোন সময়ে শশাখের নিবৃত্তি এবং পুনৰ্বার উৎপত্তি, শােথ- স্থানে উষ্ণস্পর্শ, শিরাব্যাপ্তি, বিবর্ণতা ও রােগিশরীরে রােমাঞ্চ, এই কয়েকটা শােথ রােগের সাধারণ লক্ষণ। বাতজ, পিত্তজ, কফজ, বাতপিত্তজ, পিত্তমেজ, ত্রিদোষ ভেদে শােথরোগ ৭ সাতপ্রকার।

 

বাতজ-শােথ–বাতজ-শশাথ একস্থানে স্থির থাকে না, সুতরাং বিনা কারণেও সময়ে সময়ে আরােগ্য হইয়াছে বলিয়া বােধ হয়। শশাখের উপরের

 

চামড়া পাতলা, কর্কশ, অরুণ বা কৃষ্ণবর্ণ, স্পর্শশক্তি হীন ও ঝিনি ঝিনি বেদনা- বিশিষ্ট হয়। এই শােথ টিপিলে বসিয়া যায় এবং ছাড়িয়া দিলেই পুনর্ধার উন্নত হইয়া উঠে। দিবাভাগে এই শােথের বৃদ্ধি এবং রাত্রিকালে হ্রাস পাইয়া থাকে।

 

পিত্তজ-শােথ—পিত্তজ-শােথ কোমলস্পর্শ, গন্ধযুক্ত ও কৃষ্ণ, পীত বা অরুণবর্ণ এবং উয়াবিশিষ্ট ও দাহযুক্ত। এই শােথ অতিশয় যন্ত্রণা প্রদান

 

করিয়া ক্রমশঃ পাকিয়া উঠে। ইহাতে ভ্ৰম, জর, ঘর্ম, পিপাসা, মত্ততা ও চক্ষুদ্বয়ের রক্তবর্ণত, এই কয়েকটা লক্ষণ লক্ষিত হইয়া থাকে

 

কফজ-শোথ–কফজ-শােথ গুরু, একস্থানস্থায়ী ও পাণ্ডুবর্ণ। ইহাতে অরুচি, মুখাদি হইতে জলস্রাব, নিদ্রা, বমি ও অগ্নিমান্দ্য হইয়া থাকে। এই শােথ টিপিলে বসিয়া যায়; কিন্তু ছাড়িয়া দিলে পুনৰ্ব্বার তৎক্ষণাৎ উখিত হয় না। রাত্রিকালে ইহার বৃদ্ধি ও দিবসে হ্রাস হয়। কঙ্কজ-শােথ বিলম্বে বৰ্দ্ধিত ও বিলম্বে প্রশমিত হইয়া থাকে

 

এইরূপ দুইটা দোষের লক্ষণ প্রকাশিত হইলে, তাহাকে সেই সেই দুই দোষ- জাত এবং তিন দোষের লক্ষণ দেখিলে, ত্রিদোষজ শােথ বলিয়া বুঝিতে হইবে।

 

অবস্থানভেদ–যে কোন শােথজনক দোষ আমাশয়ে অবস্থিত থাকিলে, বক্ষঃস্থল হইতে উৰ্দ্ধদেহে, পকাশয়ে থাকিলে মধ্যশরীরে অর্থাৎ বক্ষঃস্থল হইতে পকাশয় পৰ্যন্ত অবয়বে ; মলাশরে থাকিলে কটিদেশ হইতে পদতল পর্যন্ত এবং সর্বশরীরে বিস্তৃত থাকিলে সর্বাঙ্গে শােথ হইয়া থাকে।

 

সাধ্যাসাধ্য-নির্ণয়—মধ্যদেহে বা সৰ্ব্বাঙ্গে যে শােথ হয়, তাহা কষ্ট সাধ্য। যে শােথ বাম, দক্ষিণ বা উদ্ধ-অধ:-বিভাগানুসারে যে কোন অৰ্ধাঙ্গে উৎপন্ন হয় ; অথবা যে শােথ নিম্ন অবয়বে উৎপন্ন হইয়া ক্রমশঃ উপরদিকে বিস্তৃত হইতে থাকে, সেই সােথ প্রাণনাশের সম্ভাবনা। কিন্তু পা প্রভৃতি অন্যান্য রােগের উপদ্রবরূপে যদি প্রথমে পাদদেশে শােথ হইয়া ক্রমশঃ উদ্ধাবয়বে বিস্তৃত হয়, তবে তাহা মারাত্মক নহে। স্ত্রীদিগের প্রথমে মুখে উৎপন্ন হইয়া ক্রমশঃ পায়ের দিকে যে শােথ অবতরণ করে, তাহা তাহাদিগের প্রাণনাশক। স্ত্রী বা পুরুষ যে কোন ব্যক্তির গুহৃদেশে প্রথমে শােথ হইলে, তাহাতে তাহার প্রাণ বিনষ্ট হয়। এইরূপ কুক্ষি, উদর, গলদেশ ও মর্মস্থানজাত শােথও অসাধ্য।

 

যে শোথ অতিশয় স্কুল ও কর্কশ, অথবা যে শােথে শ্বাস, পিপাসা, বমি, দৌর্বল্য বর ও অরুচি প্রভৃতি উপদ্রব উপস্থিত হয়, সেই সােথও অসাধ্য। বালক, বৃদ্ধ ও দুর্বল ব্যক্তিদিগের শােথ হইলে, তাহাও অসাধ্য বুঝিতে হইবে।

 

চিকিৎসা–কোন রােগবিশেষের সহিত শােথয়ােগ উপস্থিত হইলে, সেই সেই রােগের সহিত শােথনাশক ঔষধাদি প্রয়ােগ করিতে হয়। মল-মূত্র পরিষ্কার রাখা এই রােগে বিশেষ আবশ্যক। বাতজ-শশাথে কোষ্ঠবদ্ধ থাকিলে দুগ্ধের সহিত উপযুক্ত মাত্রায় এর তৈল পান করাইবে। দশমূলের কাথ বাতজ- | শােথে বিশেষ উপকারক। পিত্তজ-শােথ গােমূত্রের সহিত • দুই আনা মাত্রায় তেউড়ীমূলচুর্ণ সেবন করাইবে; অথবা তেউড়ীমূল, গুলঞ্চ ও এিফলা, ইহাদের কাথ পান করিতে দিবে। কফজ শশাথে পুনর্নব, শুঠ, তেউড়ীমূল, গুলঞ্চ ও হরীতকী ও দেবদারু, ইহাদের কাথে গােমূত্র ও গুগ্‌গুলু • দুই আনা প্রক্ষেপ দিয়া পান করাইবে। মরিচের চূর্ণের সহিত বিপত্রের রস, নিমপাতার রস, শ্বেত-পুনর্নবার রস, সমুদায় শােথরােগেই ‘বিশেষ উপকারক

 

মনসাসীজের পাতার রস মর্দন করিলে শােখের শান্তি হইয়া থাকে। পথ্যাদি কাথ, পুনর্নবাষ্টক ও সিংহাস্যাদি পাচন, মাণমণ্ড, শােথারিচূর্ণ, শােথারি মঞ্জুর, কংস-হরীতকী, কটুকাদ্যলৌহ, ত্রিকাদিলৌহ, শােথক লাল রস, পঞ্চামৃত-রস, দুগ্ধবতী এবং গ্রহণীরােগােক্ত স্বর্ণপর্গ টী প্রভৃতি ঔষধ শােথরােগে বিবেচনাপূর্বক প্রয়ােগ করিতে হয়। পাণ্ডুজ শােথরােগে তক্রমর ও সুধানিধি নামক ঔষধ বিশেষ উপকারী। দুগ্ধবতী ও স্বর্ণপল্প টী সেবনকালে লবণ ও জল বন্ধ রাখিয়া, কেবল দুগ্ন আহার করিতে দিতে হয়। অরাদির সংস্রব না থাকিলে, চিত্ৰকাদি ধৃত সেবন এবং শােথস্থানে ‘পুনর্নবাদি তৈল ও বৃহৎ শুস্ক মূলকা তৈল প্রভৃতি মর্দন করাইতে পারা যায়।

 

পথ্যাপথ্য – উদরবােগে যেসমস্ত পথ্যাপথ্য লখিত হইয়াছে, শােখ- রােগেও সেইসমস্ত বিশেষরূপে প্রতিপালন করা আবশ্যক।

কোষবৃদ্ধিরােগ

 

সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ— স্বকীয় প্রকোপক কারণসমূহদ্বারা বায়ু কুপিত হইয়া, কুঁচকি স্থান হইতে অণ্ডকোষে আগমন করে এবং তৎপরে পিত্তাদি দোষ ও দুষ্যকে কুপিত করিয়া, অণ্ডকোষ বর্ধিত, স্ফীত ও বেদনাযুক্ত করিলে, তাহাকে বৃদ্ধিরােগ কহে। বৃদ্ধিরােগ ৭ সাত প্রকার :-বাতজ, পিত্তজ, শ্লেষ্মজ, রক্তজ, মেদোজ, মূত্রজ ও অজ।

 

প্রকারভেদে লক্ষণ–বাতজ-বৃদ্ধিরােগে অণ্ডকোষ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া, বায়ুপূর্ণ চৰ্ম্মপুটকের ন্যায় আকৃতিবিশিষ্ট হয় এবং তাহা রুক্ষ ও সামান্যমাত্র কারণে বেদনাযুক্ত হইয়া থাকে। পিত্তজ-বৃদ্ধিেেগ অণ্ডকোষ পক-যজ্ঞডুমুরের ন্যায় রক্তবর্ণ এবং দাহ ও উষ্মাযুক্ত হয়। বেশী দিন অবস্থিত থাকিলে, এই বৃদ্ধি পাকিয়া উঠে। কফজ-বৃদ্ধিতে অণ্ডকোষ শীতলস্পর্শ, ভারাক্রান্ত, চিক্কণ, ক- যুক্ত, কঠিন ও অল্পবেদনাযুক্ত হইয়া থাকে। রক্তজ-বৃদ্ধি—কৃষ্ণবর্ণস্ফোটকব্যাপ্ত এবং পিত্তজ-বৃদ্ধির অন্যান্য লক্ষণযুক্ত হয়।

 

তাফলের ন্যায় এবং মৃদুস্পর্শ ও কফজ বৃদ্ধির লক্ষণযুক্ত হইয়া থাকে। নিয়ত মূত্রবেগ ধারণ করিলে, মুত্রজ-বৃদ্ধিরােগ জন্মে ; এই বৃদ্ধিতে, শয়নকালে অণ্ডকোষ জলপূর্ণ চৰ্ম্মপুটকের ন্যায় সংক্ষোভিত, মৃদুস্পর্শ ও বেদনাযুক্ত হয়। ইহাতে সময়ে সময়ে মূত্ৰকৃন্দ্রের বেদনা উপস্থিত হয় এবং ইহা সঞ্চালিত হইলে অধােদিকে ঝুলিয়া পড়ে।

 

অন্ত্রবৃদ্ধি–বায়ুপ্রকোপক আহার, শীতলজলে অবগাহন, মলমূত্রের বেগধারণ বা অনুপস্থিত বেগে বেগদান, ভারবহন, পথ পৰ্যটন, বিষমভাবে অঙ্গবিন্যাস এবং দুঃসাহসিক কাৰ্য প্রভৃতি দ্বারা চালিত হইয়া যখন ক্ষুদ্রযন্ত্রের কিয়দংশ সঙ্কুচিত করিয়া অধােদিকে বজ্জণ-সন্ধিতে আনয়ন করে, তখন ঐ সন্ধিস্থলে গ্রন্থিরূপে শােথ উৎপন্ন হয় ; ইহাকেই অন্ত্রবৃদ্ধি কহে। অগ্রবৃদ্ধি অচিকিৎস্য ভাবে অধিক দিন অবস্থিত থাকিলে, অণ্ডকোষ ক্রমশঃ বর্জিত, ঋত, বেদনাযুক্ত ও স্তম্ভিত হয়। কোষ টিপিলে, অথবা কখন কখন আপনা হইতেই, শব্দের সহিত বায়ু উপর দিকে যায় এবং পুনৰ্ব্বার নামিয়া আসিয়া কোষদ্বয়ে শােথ উৎপাদন করে। অন্ত্রবৃদ্ধি অসাধ্য রােগ।

 

একশিরা ও বাতাশা— অমাবস্যা, পূর্ণিমা অথবা দশমী’ ও একাদশী তিথিতে কপা এবং সন্ধিসমূহে বা সর্বাঙ্গে বেদনা প্রভৃতি লক্ষণের সহিত প্রবল জর হইয়া, একরূপ কোষবৃদ্ধি রােগ উৎপন্ন হয় ; দুই তিন দিন পরে আবার আপনা হইতেই তাহা নিবারিত হইয়া যায়। একটী কোষ -দ্ধিত হইলে, চলিত কথায় তাহাকে “একশিরা” এবং দুইটা কোষ বন্ধিত হইলে তাহাকে বাতশিরা” কহে।

 

বৃদ্ধরােগ চিকিৎসা — যাবতীয় বৃদ্ধিরােগেই প্রথমাবস্থায় চিকিৎসা করা আবশ্যক; নতুবা তাহা কষ্টসাধ্য বা অসাধ্য হইয়া উঠে। সকল বৃদ্ধিতেই বিরেচন করা আবশ্যক। বাতজ-বৃদ্ধিতে দুগ্ধের সহিত এবং পিত্তজ ও রক্তজ বৃদ্ধিতে দশমূলের কাথের সহিত উপযুক্ত মাত্রায় এরও তৈল পান করাইয়া বিরেচন করাইবে। কফজ ও মেনোজ বৃদ্ধিতে ত্ৰিকটু ও ত্রিফলার কাথের সহিত যক্ষার • দুই আনা ও সৈন্ধব লবণ • দুই আনা মিশ্রিত করিয়া পান করাইবে; ইহাও বিরেচক ঔষধ। মূত্ৰজ-বৃদ্ধিতে অস্ত্রবিশেষ দ্বারা ভেদ করিয়া জলস্রাব করা অর্থাৎ “ট্যা” করা আবশ্যক। অন্ত্রবৃদ্ধি যতদিন কোষপর্যন্ত উপস্থিত না হয়, সেই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা করিলে উপশম হইয়া থাকে। | অন্ত্রবৃদ্ধি শান্তির জন্য রান্না, যষ্টিমধু, গুলঞ্চ, এরগুমুল, বেড়েলা ও গােঙ্গুরের সহিত অথবা কেবল ডেলার মূলের সহিত দুগ্ধ পাক কায়া, সেই দুগ্ধের সহিত এরগুলৈ পান করাবে।

 

বচ ও সর্ষপ কিংবা শজিনার ছাল ও সর্ষপ, অথবা ছাতিমবীজ ও আদা কিংবা শ্বেত-আকন্দের ছাল কঁজির সহিত বাটিয়া প্রলেপ দিলে, সমুদায় বৃদ্ধিরােগেরই শান্তি হইয়া থাকে। একখানি তাওয়ায় করিয়া অগ্নিজালে জয়ন্তীপাতা গরম করিয়া কোধে বাঁধিয়া রাখিলে, কোষবৃদ্ধির উপশম হয়। ভক্তোদরীয়, বৃদ্ধিবাধিকাৰটী, বাতারি, শতপুষ্পদ্য ঘৃত, গন্ধহস্ত তৈল এবং শ্লীপদবােগোক্ত কৃষ্ণাদিমােক ও নিত্যানন্দরস প্রভৃতি ঔষধ বিবেচনাপূর্বক প্রয়ােগ করা আবশ্যক। কোষে মালিশের জন্য সৈন্ধবাদ্য ঘৃত, শােথরােগােক্ত পুনর্নবা তৈল ও শুদ্ধমূলাদি তৈলও ব্যবহার করাযা। অন্ত্রবৃদ্ধির প্রবলাবস্থায় “ট্রস নামক যন্ত্র ব্যবহার উপকারী।

 

ইহাতে কাঞ্চনার গুগ্‌গুলু সেবন, দুন্দরী ও সিন্দুবাদি তৈল মর্দন এবং নিও- তৈল ও নিম্বাদি-তৈলের নস্য গ্রহণ বিশেষ উপকারী।

 

অপচী চিকিৎসা—গণ্ডমালা অপচীরূপে পরিণত হইলে, শজিনাছাল ও দেবদারু একত্র কাজির সহিত পেষণ করিয়া, অগ্নিতে উত্তপ্ত করিয়া প্রলেপ দিবে; অথবা শ্বেতসর্ষপ, নমত্র ও ভেলা অগ্নিতে পােড়াইয়া, ছাগমূত্রের সহিত পেষণ করিয়া প্রলেপ দিবে। গুঙ্গাদ্য তৈল ও চন্দনাদি তৈল মর্দন করিলে, অপচীরােগের বিশেষ উপকার হয়।

 

গ্রন্থরােগ চিকিৎসা–গ্রন্থিরােগে দ্রাক্ষা বা ক্ষুরসের সহিত হরীতকী চূর্ণ সেবন করাইবে। মৌসফুল, জামছাল, অর্জুছাল ও বেতছাল পেষণ করিয়া প্রলেপ দিবে। দন্তীমুল, চিতামূল, সীজের আঠা, আকন্দের আঠা, গুড়, ভেলার আঁটি ও হীরাকস, এইসমস্ত দ্রব্যের প্রলেপ দিলে গ্রন্থি পাকিয়া উঠে এবং তাহা হইতে ক্লেদাদি নির্গত হইয়া আরােগ্য হয়। সাচীক্ষা, মূকভস্ম, ও শঙ্খচূর্ণের প্রলেপ দিলেও গ্রন্থি এবং অৰ্ব্বদ রােগের শাস্তি হয়। অৰ্ব্বদরােগে জোকাদারা রক্তমােক্ষণ করা আবশ্যক। ডুমুর-পত্র বা অন্য কোন কর্কশপত্র দ্বারা অৰ্ব্বদস্থানে ঘর্ষণ করিয়া, তাহার উপর ধূনা, প্রিয়, রক্তচন্দন, লােধ, রসাঞ্জন, যষ্টিমধু, একত্ৰ পেষণ ও মধুর সহিত মিশ্রিত করিয়া প্রলেপ দিবে। বটের আঠা, কুড় ও পাংশু-লবণ অৰ্ব্বস্থানে লেপন করিয়া, বটপত্ৰদ্বারা বাঁধিয়া রাখিবে ; শজিনার বীজ, সর্ষপ, তুলসী, যব ও করবীর মূল একত্র ঘােলের সহিত বটিয়া প্রলেপ দিতে ও অদ রােগের উপশম হয়। এই সমস্ত ক্রিয়াদ্বারা গ্রন্থি ও অৰ্ব্বদ রােগের শান্তি না হইলে, চিকিৎসা করা আবশ্যক।

 

পথপথ্য–গলগণ্ডাদি রােগে কোষবৃদ্ধ রোগের ন্যায়ই সমুদায় পথ্যাপথ্য প্রতিপালন করিতে হয়, এই জন্য ইহাতে পথ্যের স্বতন্ত্র নিয়ম কিছু লিখিত হইল না।

শ্লীপদরােগ

 

দোষভেদে শ্লীপদ লক্ষণ— শ্রীপদের সাধারণ নাম “গােদ”। এই রােগে প্রথমতঃ কুঁচকিস্থানে বেদনা হইয়া, পরে পাদদেশে শােথ হইয়া থাকে। প্রথমাবস্থায় অনেকের জ্বর হইতেও দেখা যায়। কফের প্রকোপ হইতেই যদিও এই রােগ জন্মে, তথাপি বাতাদি-দোষের আধিক্যানুসারে ইহাতে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ প্রকাশিত হয়। পিদে বায়ুর আধিক্য থাকিলে, শােথস্থান কৃষ্ণবর্ণ, রুক্ষ, ফাটা ফাটা ও তীব্রবেদনাৰুক্ত হয় । আরও ইহাতে সৰ্ব্বদা জ্বর ও অকস্মাৎ বেদনার হ্রাসবৃদ্ধি হইয়া থাকে। পিত্তের আধিক্যে শাপদ কোমল, পীতবর্ণ, দাহবিশিষ্ট ও জ্বরসংসৃষ্ট হয়। শ্লেষ্মর আধিক্যে শ্লীপদ কঠিন, চিক্কণ, শ্বেত বা পাণ্ডুবর্ণ এবং ভারযুক্ত হইয়া থাকে।

 

অসাধ্য লক্ষণ—যে শ্লীপদ অতিমাত্র বর্ধিত হইয়া উঠে, অথবা ক্রমশঃ বদ্ধিত হইয়া উইঢিপির মত কতকগুলি উচ্চশিখরবিশিষ্ট হয়, যাহা এক বৎসরের অধিক কালজাত, যে শ্রীপদে স্রব ও কণ্ডু থাকে এবং যে শ্রীপদে বাতাদি- দোষ-জনিত সমুদায় উপদ্রব প্রকাশিত হয়, সেইসকল শ্লীপদ অসাধ্য।

 

যে সকল দেশে অধিক পরিমাণে পুরাতন জল সঞ্চিত থাকে এবং যে দেশ সকল ঋতুতেই শীতল, প্রায় সেইসকল দেশেই শ্রীপদ রােগ অধিক জন্মে।

 

দোষভেদে চিকিৎসা—প্রথম উৎপন্ন হইবামাত্র এই রােগের চিকিৎসা করা উচিত ; নতুবা অসাধ্য হইয়া উঠে। উপবাস, বিরেচন, স্বেদ, প্রলেপ এবং শ্লেষ্মনাশক ক্রিয়াসমূহ এই রােগের শান্তিকারক। ধুতুরা, এরও, নিসিন্দা, শ্বেতপুনর্নবা, শজিনা ও সর্ষপ এইসমস্ত দ্রব্য বটিয়া প্রলেপ দিবে, অথবা চিতমূল, দেবদারু, শ্বেত-সর্ষপ ও শজিনামুলের ছাল, গোমূত্র সহ বটিয়া, গরম করিয়া প্রলেপ দিলে, শ্রীপদের শান্তি হয়। শ্বেতসর্ষপ, শজিনাবীজ, শণ- বীজ, মসিনা, যব ও মুলার বীজ, মনসাসীজের পাতার রসসহ ৰাঁটিয়া প্রলেপ | দিলেও শ্লীপদ-রােগের শান্তি হইয়া থাকে। পিত্তজন্য শ্লীপদে মঞ্জিষ্ঠা, যষ্টিমধু, রান্না, গুড়কামাই ও পুনর্নবা, এই সমস্ত দ্রব্য কাজিতে বাটিয়া প্রলেপ দিবে। অথবা মদনাদি প্রলেপ ব্যবহার করাইবে। তালের রসের সহিত বেড়েলামুল

 

বাটিয়া প্রলেপ দিলে, সৰ্ববিধ শ্লীপদেই বিশেষ উপকার হয়। বৈচিগাছের উপর যে পরগাছা হয়, তাহার মূল পেষণ করিয়া ঘূতের সহিত সেবন করাইলে, অথবা সূত্রদ্বারা সেই মূল অলাদেশে বঁধিয়া রাখিলে শ্রীপদের উপশম হইয়া থাকে। এরওতৈলে হরীতকী ভাজিয়া গােমূত্রের সহিত সেবন করাইতেও শ্লীপদ রােগের শান্তি হয়। কণাদিচূর্ণ, পিঙ্গল্যাদি চূর্ণ, কৃষ্ণাদি মােক, নিত্যানন্দরস, স্লীপদ- গজকেশরী, সৌরেশ্বর বৃত এবং বিড়াদি তৈল প্রভৃতি ঔষধ বিবেচনাপূর্বক শীপদ-রোগের শান্তিজন্য প্রয়ােগ করা আবশ্যক।

 

পথ্যাপথ্য— কোষবৃদ্ধিরােগে যেসকল পথ্যাপথ্য লিখিত হইয়াছে, শ্রীপদ-ব্রেগেও সেইসমস্ত যথাযথরূপে ব্যবস্থা করিতে হইবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.