মোটরসাইকেল চালানো শেখা।

মোটরসাইকেল চালানো শেখা

 

এ সময়ে সাধারণত তীব্র শীত পড়ে। এবার আবহাওয়ার অবস্থা এলােমেলাে। শীতের কোনাে ভাব দেখা যাচ্ছে না। রাত গভীর হলেখানিক ঠান্ডা লাগে। তা ছাড়া কেবল শীত-শীত ভাব । প্রচণ্ড শীত নেই।বিকেলবেলা। সূর্য দক্ষিণপাশে কাত হয়ে ঘুরে পশ্চিমদিকে যাচ্ছে।সূর্যের তেজ একেবারেই কমে এসেছে। দেখে মনে হচ্ছে নরম সূর্য। মহিমফুল হাতা শার্টের ওপর হাতাকাটা সােয়েটার পরেছে। সােয়েটারের রংনীলাভ বেগুনি। তাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। এতটা পথ হেঁটে এসে মহিমের এখন গরম লাগছে। সে গা থেকে সােয়েটার খুলে ফেলবে কিনা ভাবতেগিয়ে থমকে দাঁড়াল।

বিরিয়ানি রেসিপি।

সামনে লতাপাতার জঙ্গলে ঢাকা ভেঙেপড়া পরিত্যক্ত একটা ঘরসেখানে কারও থাকার কথা নয়। ১৪-১৫ বছর বয়সের একজন ছেলেসাইকেল চালিয়ে ঝােপজঙ্গলে ঢাকা ওই পরিত্যক্ত ঘরের দিকে গেছে।যাওয়ার সময় সে সাইকেল বেল বাজাতে বাজাতে গেছে। সাইকেলেরবেলেও আওয়াজ হচ্ছিল ক্রিং ক্রিং।ছেলেটা সাইকেল থেকে নেমে মহিমের দিকে তাকাল। সে একভাবে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এখান থেকে কেবল ছেলেটির দুই চোখদেখা যাচ্ছে। সেই চোখে একইসঙ্গে কৌতূহল আর বিস্ময়। ছেলেটির মাথাভরতি ঘন কালাে কোঁকড়ানাে চুল।

 

মহিমের বয়স ১৪ বছর। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। থাকে দিনাজপুরে। গতসপ্তাহে ইশকুলে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে।মা বললেন, এই মহি, ছােটোখালার বাড়িতে যাবি?মহিমকে মা আদর করে মহি বলে ডাকেন। বাবা কখনাে ডাকেন মিহিবলে আবার কখনাে বলেন মহীয়ান। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মহিম।তাই তারা তাকে যেমন খুশি আদর করেন।মহিম লাফিয়ে উঠল। সে বলল, অবশ্যই যাব। কখন রওনা হতে হবেবলে।মা বললেন, তাের বাবা গেছেন ট্রেনের টিকিট আনতে। এলে বলতেপারব।

 

নতুন কিছো  –  (বিবিয়ানা) আমরা বেচে থেকে ও মরেগেছি।আন্নায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

 

চোখ বড়াে বড়াে করে মহিম বলল, আমরা ট্রেনে যাব!মহিম এর আগে বার দুয়েক ট্রেনে চড়েছে। ট্রেনে চড়ে যেতে তারভীষণ ভালাে লাগে। ট্রেনের জানালা খােলা থাকে। বাইরে থেকে হু হু করেবাতাস ঢােকে ভেতরে। সেই বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায় না কিন্তু নাড়িয়েদিয়ে যায়। জানালা দিয়ে রেললাইনের ধারের গাছগুলাে কেমন দ্রুত সরে-সরে যায়। আঁকানাে ছবির মতাে কেবল টেনে যাওয়া সবুজ দেখা যায়।মনে হয় ব্রাশ দিয়ে কাগজে সবুজ রং টানা হয়েছে। দূরে স্থির মাঠ, গ্রামধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে। কী যে অসম্ভব আনন্দের সেই অনুভূতি।

 

আর আছে অদ্ভুত সব মানুষ। ট্রেন চলতে থাকে। কামরায় আসতেথাকে হরেকরকমের মানুষ। যে ভিক্ষা করে সে এসে হাত পেতে শুধু-শুধুবলে না যে আমাকে দুটো টাকা দেন। সে গান গায়। কখনাে কয়েকজনমিলে একসঙ্গে গান গেয়ে ভিক্ষা করে। কেউ আবার হাত ভরতি বই নিয়েআসে বিক্রি করতে। সেও সুরে-সুরে বই বেচে। ডিমসিদ্ধ, ছােলা-মুড়ি-চানাচুর মাখানাে, উফ কী যে মজা! বাসে, গাড়িতে, প্লেনে এই মজা নেই।

 

ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে মহিম। বাবা ডাক্তার। তিনি দিনাজপুর সদরহাসপাতালে চাকরি করেন। চট করে ছুটি জোগাড় করতে পারেন না। ছুটিজোগাড় হলেও চেম্বার বন্ধ রেখে তার পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব হয় না।আবার মহিমের ইশকুল খােলা থাকে, তার পরীক্ষা। সবকিছু মিলিয়েবেড়াতে যাওয়া আটকে থাকে।মহিম ভেবেছে বড়াে হয়ে সে পুরাে পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। সে ঘুরবেট্রেনে চড়ে। স্টেশনে ট্রেন থামলে কত মানুষ নেমে যাবে আবার অনেকমানুষ উঠবে। প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হুড়ােহুড়ি করে ট্রেনে ওঠাযেন অন্যরকম এক দৃশ্য।

 

সে সবসময় মুগ্ধ হয়ে দেখে

 

 

রিনুরা থাকে নীলমণিগঞ্জ। তার কাছাকাছি রেলস্টেশনহচ্ছে মােমিনপুর। আগে ওই রেলস্টেশনের নাম নীলমণিগঞ্জ ছিল। পরেমােমিনপুর হয়েছে। সেখানে কোনাে ট্রেন থামে না। আমরা গিয়ে নামচুয়াডাঙ্গা স্টেশনে। সেখান থেকে নীলম ণিগঞ্জ যাব।মহিমের ছােটো খালার নাম রিনু। মহিমের মায়ের নাম বিনু।মহিম তাকিয়ে দেখল সামনে সেই রেলস্টেশন। প্লাটফরমের দুপাশেসাদার ওপর কালাে কালি দিয়ে স্টেশনের নাম লেখা আছে। এপাশ থেকেস্টেশনের নাম পড়া যাচ্ছে,

 

মােমিনপুর। এই রেলস্টেশনে কোনাে ট্রেনদাঁড়ায় না। কেন ট্রেন দাঁড়ায় না, কতদিন হলাে দাঁড়ায় না তা মহিমকেকেউ বলেনি।রেলস্টেশনের প্লাটফরমে ঝােপজঙ্গলে ঢাকা ভেঙে পড়া ঘরের কাছেসাইকেল চালিয়ে যে ছেলেটি এসেছিল তাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না।সে কোনদিকে গেছে মহিম তাও অনুমান করতে পারল না।

 

নতুন কিছো পড়ুন  –

কক্সবাজার

উত্তর-দক্ষিণদিক বরাবর পাশাপাশি দুটো রেললাইন চলে গেছে।রেললাইনের পুব আর পশ্চিমপাশে সবুজ ঘাসে ঢাকা উঁচু প্লাটফরম। বেশঅনেকখানি উঁচু। প্লাটফরম দুপাশে খাড়া ঢাল হয়ে নিচে নেমে গেছে।পশ্চিমদিকের প্লাটফরমের মাঝখানে লম্বা ঘর। তার সামনে টানাবারান্দা। ওপরে ছাউনি। বারান্দায় সিমেন্ট দিয়ে বানানাে বসার জায়গাআছে। দেয়ালে লেখা যাত্রী ছাউনি লম্বা ঘরের দরজার ওপরে লেখা যাত্রী বিশ্রামাগার। অনেক পুরাতন লেখা। তবু পড়া যাচ্ছে। যাত্রী

 

বিশ্রামাগারেরদুপাশে আরও দুটো ঘর আছে। সে দুটো কিসের ঘর মহিম বুঝতে পারল। সেখানে কিছু লেখা নেই। প্লাট ফরমের আরেকদিকে ঝােপের ভেতরভাঙা ঘর।ওপাশে একটা কাঁঠালগাছ। আর কোথাও কোনাে বড়াে গাছ নেই।পুরাে রেলস্টেশন কেমন যেন শান্ত সুনসান নীরব।

 

আচমকা ট্রেনের হুইসেল শুনতে পেয়েছে মহিম। ট্রেন আসছেজোরেজোরে হুইসেল বাজাচ্ছে। একটা গােরু অলস পায়ে রেললাইন পার হয়েগেল। ট্রেন এগিয়ে এসেছে। ট্রেন আসছে পশ্চিমপাশের প্লাটফরমের দিকে।মহিম ওদিকেই দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখল প্লাটফরমের ওপর একজন মানুষসবুজ কাপড়ের পতাকা মেলে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার অন্য হাতে লালকাপড়ের পতাকা গুটিয়ে রাখা।যে-

 

স্টেশনে ট্রেন থামে না অনেকদিন সেখানে রেলবিভাগের কোনােমানুষ থাকবে মহিম এমনটা আশা করেনি। তাছাড়া এই মানুষ কোথা থেকেহুস করে এসে উদয় হয়েছেন সেটাও সে খেয়াল করেনি। কিছুক্ষণ আগেওপ্লাটফরমে কোনাে মানুষ দেখা যায়নি।পরপর দুবার হুইসেল বাজিয়ে রেলস্টেশন পার হয়ে ট্রেন চলে গেল।উত্তরদিক থেকে ট্রেন এসেছিল।

 

দক্ষিণদিকে গেছে। পতাকা হাতে সেইলােকটাও যেন চোখের নিমেষে মিলিয়ে গেল। তাকে আর দেখা যাচ্ছে না।মহিম হেঁটে হেঁটে প্লাটফরমের ওপর উঠে এলাে। ইট বিছানােপ্লাটফরমের ইটের ফাকে-ফাকে সবুজ ঘাস। তাতে পুরাে প্লাটফরম সবুজদেখাচ্ছে। মহিম দেখল সবুজ ঘাসের ওপর সেই লােকটি হাঁটুমুড়ে বসেআছেন। তার চেহারায় নির্বিকার ভাব। পরনে লুঙ্গি। গায়ে গাঢ় নীল রঙেরজামার ওপর খাকি সােয়েটার। বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ৬৫ বা ৬৬ বছরহতে পারে।

 

মহিম কাছে এসে বলল আসসালামু আলাইকুম

 

লােকটি উদাস চোখে মহিমকে দেখলেন। কিছু বললেন না। মহিমবলল, আমি এখানে বেড়াতে এসেছি। খালার বাড়ি। নীলমণিগঞ্জআমারনাম মহিম। আপনার নাম কী?লােকটি বললেন, সফর আলি।মহিম জিগ্যেস করল, এই স্টেশনে ট্রেন থামে না কেন?সফর আলি বললেন, সরকারের হুকুম ।মহিম বলল, আগে ট্রেন থামত এখানে?সফর আলি আলতাে করে ওপর-নিচ মাথা ঝাকালেন। তাতে বােঝাগেল আগে এখানে ট্রেন থামত।মহিম জানতে চাইল, কতদিন ধরে বন্ধ এই স্টেশন?

 

সফর আলি দূরে দৃষ্টি ভাসিয়ে বললেন, একযুগ দুইযুগ, যুগের পর যুগগেলেও বন্ধ কিছুর হিসেব থাকে না। যা বন্ধ হয়ে গেছে তা বন্ধ ।মহিম বুঝতে পারল এই মানুষটি সরাসরি কিছু বলবেন না। মনে হচ্ছেতিনি ভাবের রাজ্যে চলে গেছেন। তার কথায় গভীর ভাবের আবেশ। মহিম।জিগ্যেস করল, আপনি এখানে থাকেন?

 

সফর আলি মুখে কিছু বললেন না। আবার ওপর-নিচ মাথা ঝাকা লেন।মহিম বলল, একটা ছেলেকে দেখলাম সাইকেল চালিয়ে গেল ওদিকে।হাত তুলে আঙুল দিয়ে মহিম প্লাট ফরমের একপাশে জঙ্গলে ঢাকা ভাঙাঘরটা দেখাল।সফর আলি মুখ তুলে মহিমের দিকে তাকালেন। তার দুই ভুরু কুঁচকেআছে। তিনি তাকিয়ে আছেন স্থির চোখে।মহিম বলল, আমার বয়সী। সাইকেল থেকে নেমে আমার দিকেতাকাল। কেমন যেন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। সাইকেল চালাতে

 

আমিওখুব পছন্দ করি। দিনাজপুরের বাসায় আমার সাইকেল আছে। আমিসাইকেল চালিয়ে ইশকুলে যাই। বিকেলে সাইকেল চালিয়ে খেলতে যাই।আমার খুব ইচ্ছে করছে এই প্লাটফরমের ওপর থেকে সাইকেল চালিয়ে ওইঢাল বেয়ে সাঁ করে নেমে যাই। ইস্ কী যে মজা হতাে! ছেলেটাকে আরদেখতেই পেলাম না।

 

সফর আলির ভুরু কুঁচকানাে ভাব চলে গেছে। তিনি এখন খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা চোখে তাকিয়ে আছেন। মহিম খেয়াল করেনি। এখনখেয়াল করল তিনি কথা বলছেন না। তার চোখ স্থির। তিনি মহিমের দিকে তাকিয়েআছেন হতভম্ব দৃষ্টিতে। কিছুক্ষণের ভেতর তার চোখের পলক পড়েনি।মহিমের কেন জানি সফর আলির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে অস্বস্তি লাগছে। মহিম চোখ নামিয়ে নিল।সফর আলি চোখের পলক ফেললেন। শীতল গলায় বললেন, তুমিবাড়ি যাও। সন্ধে হয়ে

 

আসছে।সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। টকটকে লাল সূর্য। মহিম কিছু বুঝতেপারল না। সে বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেল।হাঁটতে হাঁটতে মহিম প্লাটফরমের শেষ মাথায় এসে থেমেছে। কী মনেহলাে পেছন ঘুরে তাকাল। পেছনে ঝােপজঙ্গলের ভেতর ঢাকা পড়া ভাঙাঘর। ঘরের দরজার ওপাশে ভাঙা দেয়ালের মাথায় সূর্য যেন ডুববে বলেআটকে আছে। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটি। সূর্য তারপেছনে বলে মুখ অন্ধকার দেখাচ্ছে। চেহারা বােঝা যাচ্ছে না।

 

মহিম ঘুরে হেঁটে হেঁটে বাড়িতে চলে গেল

 

মহিমের ছােটোখালুর নাম হাফিজ। খুব হাসিখুশি মানুষ। সবসময় আনন্দেথাকেন। হাফিজ বলেন, “আমার ভেতর একটা ফ্যাক্টরি আছে। দুঃখ-কষ্টসেখানে ঢেলে পিষে আনন্দ বানিয়ে ফেলি। হাফিজ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বাের্ডেচাকরি করেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার।সন্ধ্যা থেকে পুরাে শহর অন্ধকার হয়ে আছে। গ্রীড লাইনে কোথাওসমস্যা দেখা দিয়েছে। হাফিজ অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বিনুআর রিনু তখন ঘরের সামনের বারান্দায় বসে গল্প করছিল।

 

মহিমের বাবাওদের নীলমণিগঞ্জে রেখে দিনাজপুরে ফিরে গেছেন। ওদের যাওয়ার সময়এসে দুইদিন থাকবেন বলেছেন।হাফিজ বাড়িতে ঢুকতেই রিনু খরখরে গলায় বলে উঠল, কিসের চাকরিকরাে? সারারাত্তিরে একটু বিদ্যুৎ তাই দিতে পারাে না! ঝড়বৃষ্টি কিছু নেই।শীতের রাত। ফ্যান-এসি চলে না। তােমাদের ইলেক্ট্রিসিটি যায় কোথায়?

 

হাফিজ হা হা করে হাসতে হাসতে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, বিদ্যুৎউন্নয়ন বাের্ড বলে পল্লী বিদ্যুতে, ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে।হেনকালে গ্রীডেতে দেখা গেল ফাকা- বিদ্যুৎ বাের্ড বলে এসাে মাের দাদা।রিনু বলল, সবকিছু নিয়েই তােমার ঠাট্টা। ইলেক্ট্রিসিটি কখন আসবেবলাে।হাফিজ ঘরের দিকে গলা বাড়িয়ে বললেন, মহিম তােমার অন্ধকার কেমন লাগছে? একে বলে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দিনাজপুর শহরে এমনঅন্ধকার খুঁজে পাবে না। চুয়াডাঙ্গা শহরেও

 

পাওয়া  যায় না। এমন ঘুটঘুটেঅন্ধকার পাবে তুমি হেথা—এই নীলমণিগঞ্জে।ঘরের ভেতর মহিম, নাহিন আর আনহা। নাহিন আর আনহা হচ্ছে।মহিমের ছােটোখালার ছেলেমেয়ে। নাহিন বড়াে। সে পড়ে ক্লাস ফাইভে।আনহা ছােটো। সে পড়ে ক্লাস থ্রিতে।বিছানার ওপর ওরা তিনজন বসে গল্প করছে। পাশের টেবিলেহারিকেন জ্বলছে। হারিকেনের আলাে ছড়িয়ে আছে ঘরে।

 

বাড়ির কাছে অনেক বড়াে একটা বাগান। আম-কাঁঠালের বাগান।সেখানে শেয়াল ডাকছে। শীতকালে শেয়াল ডাকে কম। তারা শীতে জুবুথুবুহয়ে থাকে। হঠাৎ-হঠাৎ ডেকে ওঠে। এখন কয়েকটা শেয়াল একসঙ্গেডেকে থেমে গেল।আনহা বলল, শেয়াল ডাকছে।মহিম অবাক হয়ে বলল, এখানে, বাড়ির এত কাছে!নাহিন বলল, প্রতিরাতেই ডাকে। তারপর কুকুর যেই ঘেউ ঘেউ করেডাকতে থাকে তখন শেয়ালের ডাক থেমে যায় ।কুকুরের ঘেউ ঘেউ করে ডাকার আগেই শেয়ালের ডাক থেমে গেল।মহিম আরও একবার শেয়ালের ডাক শুনবে ভেবেছিল । শেয়ালের ডাক আরশােনা গেল না।

 

শেয়ালের কথা ভুলে গিয়ে আশপাশে কী আছে

 

এখানে কী ঘটনা ঘটেসেসব মহিমকে শােনাতে শুরু করল নাহিন । আনহা বেশ উৎসাহ নিয়ে শুনছে।নাহিন বলল, শােনাে, আমাদের বাড়িতে এক ভিক্ষুক আসে, তােমাকে দেখাব। তার চশমার গ্লাসে অনেক পাওয়ার। তাতে চোখ দুটো দেখা যায় ইয়াবড়াে বড়াে। কাঁধে থাকে কালাে লম্বা ঝােলা। মা বলেছে আনহা ভালােমতােলেখাপড়া না করলে ভিক্ষুকের কাছে ওকে দিয়ে দেবে। যেসব ছেলেমেয়েলেখাপড়া করে না ভিক্ষুক তাদেরকে তার ঝােলার ভেতরে পুরে ধরে নিয়ে যায়।

 

আনহা বলল, আমি লেখাপড়া করি তাে! মা শুধু বলে আরও পড়াে,আরও পড়াে। সব পড়া শেষ হয়ে গেলে আর কত পড়ব? মা বলে বারবার।পড়াে। সারাদিন পড়াে।মহিম বলল, ভিক্ষুক ছােটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে গিয়ে কী করে?নাহিন বলল, রান্না করায়।মহিম বলল, অত ছােটো ছেলেমেয়ে রান্না করতে পারে?নাহিন বলল, ঘর মুছতে বলে, কাপড় কাচতে বলে।মহিম বলল, অতটুকু ছেলেমেয়েরা এসব কাজ করতে পারে?

 

নাহিন বলল, ছােটো ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে সে কী করে তামা বলেনি।আশপাশে।তখন হাফিজের গলা শােনা গেল, মহিম তােমার অন্ধকার কেমনলাগছে?মহিম বলল, আমার তাে খুব ভালাে লাগছে খালু। মনে হচ্ছে গুহারভেতর আছি।হাফিজ হা হা করে হাসছেন। হাসিতে তার পুরাে শরীর কাঁপছে। হাসিথামিয়ে হাফিজ বললেন, শনিবারে আমরা নীলকুঠিতে যাব। আমার অফিসছুটি।

 

আনহা বলল, নীলকুঠিতে কী আছে বাবা?হাফিজ বললেন, এখন তাে আর কিছু নেই। সব ভেঙেচুরে গেছে।তবে ছিল।আনহা আবার বলল, কী ছিল?হাফিজ বললেন, একটা বাড়ি। বিশাল বাড়ি। বাড়িতে যেমন ঘরথাকে, সেখানেও ঘর ছিল। ইংরেজ সাহেবরা সেখানে থাকত। আর ছিলমৃত্যুকূপ। যারা নীল চাষ করতে চাইত না তাদের ধরে এনে ইংরেজরা ওইমৃত্যুকূপে ফেলে দিত।আনহা বাবার কথা শুনে বুঝল

 

নীলকুঠি মানে হচ্ছে একটা বাড়ি।সেখানে থাকার ঘর আছে, এছাড়া আর কিছুই বুঝল না। সে নীলকুঠিদেখতে যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতে ইলেক্ট্রিসিটি চলে এলাে। নাহিনআর মহিম একসঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। আনহা নীলকুঠি দেখতেযাবে কিনা সেই ভাবনার কথা ভুলে গেল।

 

রিনু আর বিনু ঘরে এসেছে। রিনুর দিকে তাকিয়ে হাফিজ বললেন,তােমার জন্য ইলেক্ট্রিসিটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই বাড়ি ফিরেছি। আমিআসার আগেই তার চলে আসার কথা ছিল। বিদ্যুৎ বিভাগের লােকজন সবঅলস, বুঝতে পারছ, তারা কাজ করে না।বলে আবার হাে হাে করে হেসে উঠলেন।রাতের খাবার দেওয়া হয়েছে। খাবার আয়ােজন দেখে মহিম স্তম্ভিত হয়েগেল। তার মনে হচ্ছে এমন কোনাে খাবারের নাম তার মনে পড়ছে না যাএখানে নেই। ছােটোখালা পােলাও রান্না

 

করেছে। মহিম পােলাও খেতেপছন্দ করে। ইলিশ মাছ ভাজি, আবার ইলিশ মাছ রান্না, রুই মাছ, চিতলমাছের কোপ্তা, টিকিয়া ,  চপ, চাইনিজ সবজি, মুরগির রােস্ট, গােরুর মাংস ,চর্বি দিয়ে রান্না করা ছােলার ডাল, ডিমের কোর্মা, কয়েক রকমের ভাজি,সালাদ। এ পর্যন্ত দেখে মহিমের চোখ লেগে এলাে।

 

১৪ বাইসাইকেল৷ ছােটোখালা বলল, ধীরেসুস্থে খেতে থাক। টেবিলে জায়গা নেই বলেসব খাবার একসঙ্গে আনতে পারিনি।মহিম অবাক হয়ে বলল, আরও আছে!ছােটোখালা বলল, এগুলাে খেয়ে পেট ভরতি করে ফেলবি না। টকদই, মিষ্টি দই, মােষের দুধের দই, রসগােল্লা আর ছানার সন্দেশ আছে।

 

মহিম বলল, আর কিছু নেই

 

ছােটোখালা বলল, ও হ্যা। তাের জন্য দুধ জ্বাল দিয়ে মালাইয়ের পায়েশ বানিয়েছি। এখানে খুব ভালাে দুধ পাওয়া যায়। কালাে গােরুর দুধ।এবার যাওয়ার সময় ঘরে বানানাে ঘি দিয়ে দেব।রিনুর দিকে তাকিয়ে বিনু বলল, তাের সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি।হাফিজ বললেন, খেয়ে বলবেন আপা, রান্না নাকি বাজার থেকে টাটকাভালাে জিনিস আনা, কোনটা

 

অসাধারণ!বিনু ঘাড় ঘুরিয়ে রিনুর দিকে তাকাল। কিছু বলল না।মহিম ভেবেছিল আজ বিশেষ কোনাে উপলক্ষে এমন রান্না হয়েছে।খেতে বসে জানল কোনাে উপলক্ষ নেই। ছােটোখালা তিনদিন বিশেষরান্নার উদ্যোগ নিয়েছে। আজ তার প্রথম দিন।হিম জিগ্যেস করল, তিনদিন কেন?ছােটোখালা বলল, ওয়ান ডে ক্রিকেট ম্যাচ দেখবি তিনদিন হয়।একদিন একদিন করে তিনদিন। তিন হচ্ছে খুব পাওয়ার ফুল  ব্যাপার।বুঝলি। যেমন একবার না পারিলে দেখাে তিনবার।

 

মহিম হেসে ফেলেছে। সে মুখের ভাত চিবিয়ে গিলে ফেলল। হাসতেহাসতে বলল, ওটা তিনবার না ছােটোখালা। শতবার। একবার না পারিলেদেখাে শতবার।ছােটোখালা মহিমের পাতে ডিম তুলে দিতে দিতে বলল, কথা না বলেখেয়ে নে।নাহিন বলল, মহিম ভাইয়া শােনাে, আজকের ওয়ান ডেতে তুমি কেমনরান করাে সেটা দেখে মা সিদ্ধান্ত নেবে পরের ওয়ান ডেতে কী রান্না করবে।রিনু বলল, তুমিও অত কথা বােলাে না।

 

খেয়ে নাও। ভাজির প্লেটগুলােনিয়ে যাচ্ছি। মুরগি আর খাসির মাংস নিয়ে আসি।আনহা বলল, আমি আর খাব না।রিনু বলল, একদম কথা বলবে না। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।মহিমকে সবগুলাে খাবার একটু একটু করে খেতে হয়েছে। খাওয়াশেষে সে দই খেয়ে বলল, ছােটোখালা মিষ্টি আগামীকাল খাব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.