সুন্দর চোখ সাজানো।

 

সুন্দর চোখ সাজানো

 

যেন একটা ঘােরের ভেতরে পাখির দিনগুলাে কাটছে আজকাল। এমন একঘাের যে দিন কী রাত পাখির যেন খেয়াল নেই। আর খেয়াল রেখেই-বালাভ কী? দুদিন বাদে পাখির কাছে এদের তাে কোনাে আলাদা অস্তিত্বইথাকবে না। অস্তিত্ব নেই তাে খেয়াল রেখে লাভ কী।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।

 

কিন্তু তাই বলে কি সচেতনতাও থাকবে না? সচেতনতা তাে একটিবােধ। এবং সেই বােধ একটি সংজ্ঞা। পাখি কি সচেতনের সংজ্ঞা কাকেবলে ভুলে যাচ্ছে?পাখি সারা দিন ও রাত এসব কথা আজকাল ভাবে।এক অবান্তর অনুভব, করুণ একটি দীর্ঘশ্বাস যেন পাখিকে নিরন্তরতাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। শুকনাে খড়ের মতাে কিছু যেন সূর্যের খরতাপে

 

পাখির মনের চাতালে একভাবে পুড়ে যাচ্ছে আজকাল। সেই পােড়ার গন্ধপাচ্ছে পাখি। শব্দ পাচ্ছে খড়মড় খতুমড়। আর পাখির ঘাের লেগে যাচ্ছে।বুকের ভেতরে হাহাকারের এক নিঃশব্দ বিলাপধ্বনি সর্বক্ষণ কানে বাজছে।পাখি তখন কী করে, কোথায় যায়, কার কাছে গিয়ে নিজের কষ্টের কথা
বলে।পাখি তখন অস্থির, অস্থির।

 

সকাল নেই, দুপুর নেই, রাত নেই, পাখি তাই বেভুল হয়ে বাড়ির মধ্যেঘুরে বেড়াচ্ছে। পাখি জানে না তার মনের ভেতরে কীসব, কারা সব কালােপােশাকে নৃত্য করে। তারা খেলা করে। তারা কাছে কি দূরে, চেনা কিঅচেনা, দৃশ্য কি অদৃশ্য, ছায়াছায়া না স্পষ্ট, পাখি সেটা জানে না।আর জানে না বলে পাখির কাছে দুনিয়াটা আজকাল উল্টোপাল্টালাগে। উল্টোপাল্টা।এমন উল্টোপাল্টা যে পাখির মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয় যে সিলিং থেকেগলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে।এবং একদিন পাখি এই কাজটিই করবে!

 

ছেলেবেলায় পাখি কালিগঞ্জের বাজারে কলা কিনতে গিয়ে কানা।ফকিরের গান শুনত প্রায় দিন। শুকনাে লাউয়ের খােল বাজিয়ে ফকিরগাইত, এ জগৎ উল্টোপাল্টা, সবকিছু উল্টোপাল্টা, মানুষও উল্টোপাল্টা,জীবনেরও মূল্য নাই, ও আমার গোঁসাই, কী করি উপায় । ও হাে হাে হাে,কী করি উপায়।পাখির মনের মধ্যে আজকাল যেন সেই কানা ফকিরের গানের লাইনইগুন গুন করে। ও হাে হাে হাে, কী করি উপায় ।এসব ঘােরের ভেতরেই একেকসময় যেন মনে হয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাখিচিৎকার দিয়ে ওঠে। চিক্কার করে গলা দিয়ে রক্ত তুলে ফেলে। ও হাে হাে

কম্পিউটার-হ্যাকিং ।

হাে, ও হাে হাে হাে, আমাকে দেখাে, আমাকে দেখাে। আমি পাখি, আমারবয়স একুশ, আমার শরীরে তারুণ্য ছলছল, আমার চেহারায় কুমারীরশুভ্রতা, আমার মগজে শিল্পের সম্ভার, কিন্তু আমি এক অভিশপ্ত উর্বশী। সেইঅভিশাপ আমার চোখ কেড়ে নিচ্ছে। শুধু আমার চোখ ভালাে নেই! আরচোখ ভালাে নেই বলে আমার কিছু আর ভালাে নেই। আমার অস্তিত্বই এখননড়বড়ে। তাই আমাকে দেখাে, আমাকে দেখাে! ও হাে হাে হাে ।

 

কিন্তু বাস্তবে পাখি এসব কিছুই করতে পারে না। পাখি শুধু ভাবে।ভাবে আর ভালাে মেয়ে লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে বসে থাকে বাড়িতে। কখনও তারবিছানায়। কখনও কলতলায়। কখনও বাতিল কুয়ােপাড়ের ছায়া ছায়াঅন্ধকারে। কখনও বা সে মামীর পেছন পেছন। অবােধ এক শিশুর মতাে।মামি কখনও বলে, ঘরে যা পাখি, বিশ্রাম নে।কখনও বলে, যা তাের বন্ধুদের বাসায় ডাক। তাদের চা খেতে ডাক।পাখি জানে মামি এসব বলে তার মন ভালাে করার জন্য। কিন্তু পাখিজানে এতে তার মন ভালাে হবে না। মন তার আর কিছুতে ভালাে হবে না।

 

রাস্তায় বেরােয় না পাখি । আজকাল বিশেষ দরকার না হলে রাস্তায়বেরােয় না পাখি। কিন্তু জানে রাস্তায় তাকে একদিন বেরােতে হবে। খুবশিগগির বেরােতে হবে। চোখের জ্যোতি ক্ষয়ে যাওয়ার আগেই বেরােতেহবে। সবকিছু দেখে নিতে হবে গােগ্রাসে। যেসব দৃশ্য কিছুদিন বাদেই হয়েযাবে অদৃশ্য সেসব তুলে নিতে হবে মন থেকে। মনের নির্যাস দিয়ে তাদেরবাঁচিয়ে রাখতে হবে।আর তা যদি না হয় তাহলে পাখিকে একদিন আত্মহননের পথ বেছে নিতে হবে।

 

কথাটা ভাবতে গিয়ে তার মনের ভেতরে খুব জোরে কে যেন শিস্ দিয়েওঠে।এই শিস্ শুনলে পাখির মনের মধ্যে বৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। ঘরেরচালা উপড়ে পড়ে। সোঁ সোঁ বাতাসে ঢেউটিন উড়ন্ত বল্লমের মতাে ছুটতেথাকে দিগ্বিদিক। আকাশে বিদ্যুৎ ছােটে উল্কার মতাে।একদিন আমাকে বেরােতে হবে। একদিন আমি বেরােবই! মনে মনেবলে পাখি।পাখি চারুকলা ইনস্টিটিউটের শেষ বর্ষের ছাত্রী। সেশন জটের জন্যএখনও ফাইনাল দিতে পারেনি।

যেখানে রঙের খেলা

 

শরীরের খেলা, সৌকর্যের খেলা, স্থাপত্যের খেলা।এ এক অদ্ভুত জীবন। মানুষের ভেতরে মানুষ, রঙের ভেতরে রং,প্রকৃতির ভেতরে প্রকৃতি, এই দেখার চোখ তৈরি করে দেয় চারুকলা ইনস্টিটিউট।

 

এখানের শিক্ষকরা সকলেই তাদের কর্মক্ষেত্রে স্বমহিমায়
বিরাজমান।পাখির এখানে আসার কথা নয়, সে তার শহরের কলেজেই বিএ পড়ারচেষ্টা করছিল, এমন সময় মেজোমামা তার মায়ের কাছে দুদিনের জন্য দেখাকরতে গেল, সেসময় পাখি শখ করে রংপেন্সিলে ছবি আঁকছিল খাতারপাতায়, আর তা দেখে মেজোমামা বলল, চল, তােকে আর্ট কলেজে ভর্তিকরে দিই। তাের আঁকার হাত ভালাে।তাে মামার সঙ্গে ঢাকায় চলে এলাে পাখি। যেন কোনাে কিছু চিন্তা নাকরেই চলে এলাে। কোথায় থাকবে, কী খাবে, মাসে মাসে পয়সা জোগাবেকে, সেসব কিছু না বুঝেই যেন রাজি হয়ে গেল পাখি

 

তবে মনের গােপনে নিশ্চয় মেজোমামার ওপরে ভরসা ছিল। আর তারমায়ের মনের ভেতরেও নিশ্চয় ছিল কিছু ভরসা, নিজের ভাইটির ওপরে।কুলসুমের আশাহত জীবনে একটুখানি স্বপ্নের সঞ্চারও হয়তাে হয়েছিল।নইলে তিনিও এত দূরে মেয়েকে শুধু ছবি আঁকা-শেখার জন্য হয়তাে
পাঠাতেন না।দুইব্যাপারটা ঘটল যেন তেলেসমাতির মতাে। একদিন ভােরবেলা পাখি ঘুমথেকে উঠে চোখে ঝাপসা দেখতে লাগল। প্রথমে অত আমল দিতে চায়নিসে। ওই অবস্থাতেই সে সেদিন কলেজে গেছে। নন্দনতত্ত্বের ক্লাস ছিল।
কিন্তু পাখি মনােযােগ দিতে পারছিল না। তার চোখের ভেতরে কেমন যেনব্যথা করতে শুরু করল। তারপর পানি পড়তে শুরু করল। মনে মনে ভয়পেয়ে গেল পাখি।

 

তাড়াহুড়াে করে ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরে এলাে সে।বাড়ি মানে তার মামার বাড়ি।পাখির মা একজন গ্রাম্য মহিলা। কুলসুম গ্রাম্য কিন্তু একেবারেঅশিক্ষিত নয়। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছেন। সংসারের বড়াে সন্তান ছিলেনতিনি। এসএসসি পরীক্ষা দেবার বড়াে সাধ ছিল, কিন্তু বাবা তার আগেইতাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। স্বামীর বড়াে ব্যবসা ছিল। বাবার তখন পােস্টিংছিল খুলনায়। বিয়ের পর স্বামীর কাছে কথাটা বলতেই এক মুহূর্তে সেআবেদন নাকচ হয়ে গিয়েছিল। গর্ভবতী অবস্থাতেও তাকে কতদিন একলাবাড়িতে রেখে স্বামী ব্যবসার কাজে বাগেরহাট গেছেন, খুলনা গেছেন,বরিশাল গেছেন। প্রায়ই এদিক সেদিক যেতেন। শাশুড়ি ছিলেন না। দেবর-

 

ননদেরা ছিলেন। শ্বশুর ছিলেন। বিয়ের তেরাে বছর না পুরতেই একদিনলস্বামী হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা গেলেন। তার আগে শ্বশুর মারা গিয়েছিলেন।স্বামী মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি ভাগাভাগি হলে তিনি স্বামীর ছােট্ট ভিটাতেই
থেকে গেছেন। দেবর-ননদেরা যে যার মতাে আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তুতার মনে অনেক দুঃখ। তার বড়ােমেয়ে রাখী পনেরাে বছর বয়সেএসএসসি পরীক্ষার আগে আগে লুকিয়ে ভিন্ন গ্রামের একজনকে বিয়ে করে।বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। এ ঘটনা কিছু বছর আগের কথা।পাখি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ত।এরপর থেকে কুলসুমের সংসারে যেন নেমে এসেছে ধস। শ্বশুরবাড়িরমানুষজন মেয়ে বাড়ি ছাড়লে তাকেই প্রকারান্তরে দোষী সব্যস্ত করেছেন।

 

বড়ােমেয়েটি তার লেখাপড়ায় ভালাে ছিল। ক্লাস পরীক্ষায় ভালাে রেজাল্টকরত বরাবর । আশা ছিল মেয়েটিকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবেন। তারইমধ্যে ঘটে গেল এই অঘটন।রাখী বাড়ি পালিয়ে কোথায় গেছে তার খোঁজ করতে করতে কুলসুমপাগলের মতাে হয়ে গিয়েছিলেন।এই ঘটনার পর অনেকদিন তিনি সংসার করতে পারেননি। কান্নাকাটিও দুশ্চিন্তায় তার দিন কেটেছে।তারপর ধীরে ধীরে সংসারে আবার মন বসিয়েছেন। কিন্তু বুকেরভেতরে ক্ষত রয়ে গেছে অক্ষত যেন সেই কতকাল ধরে।এসব কথা কুলসুম কাউকে বলেন না। মনের ভেতরে লুকিয়ে রাখেন।

 

কাকেই-বা এসব বলা যায়। সন্তান দুষ্ট হতে পারে, বিপথে যেতে পারে,কিন্তু মায়েরা তাে সেই মা হয়েই থেকে যায়।তার ছােটোমেয়ে পাখি যখন আইএ পাস করল, তখন পাখিকে কোথায়পাঠাবেন এই চিন্তায় কুলসুম মনে মর্মে অধীর হয়ে উঠলেন। এরকম সময়েএকদিন পাখির মেজোমামা, তার মেজোভাইটি ঢাকা থেকে খুলনায় তারবাড়িতে এলেন দেখা করতে। পাখিকে একদিন আপন মনে খাতায় ছবিআঁকতে দেখে বলে উঠলেন, তুই আমার সঙ্গে চল, তােকে আর্ট কলেজেভর্তি করে দিই।

 

মামার কথা শুনে পাখি খুশি মনেই সায় দিয়ে বসল।কুলসুমও পাখিকে আর নিজের কাছে রাখতে সাহস পাননি। ভাইপ্রস্তাব দেওয়া মাত্রই তিনি ভাইয়ের হেফাজতে তার সঙ্গে ঢাকায় পাঠিয়েদিয়েছেন।পাখির দুই চাচা। তারা তার বাবার মতােই ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।ফুপুরা যে যার মতাে বিয়ে হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন। পাখির একচাচাতাে বােন থাকে রােকেয়া হলে। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। পাপিয়া মাঝেমধ্যেপাখির কাছে আসে। পাখি তার চেয়ে দুই বছরের বড়াে। পাপিয়া বাংলায়অনার্স পড়ে।

 

পাখির নানাবাড়ি ঢাকায়। তার নানা সরকারি চাকরি করতেন। তারশেষ বয়সের চাকরিটা ছিল ঢাকায়। এখানেই রিটায়ার করে তিনি

Leave a Reply

Your email address will not be published.