সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখার সুযোগ সবার হয় না।

 

সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখার সুযোগ সবার হয় না

 

 

নীলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ফাইনাল দিয়েছে।বরাবর সে বিগত পরীক্ষায় ভালাে ফলাফল অর্জন করেছে। পরীক্ষায়সে যে পাস হইবে তাতে কারাে সন্দেহ নেই। অনেক মেডেল অর্জনকরেছে এবং স্কলারশিপও কখনাে ফাঁক যায়নি। পরীক্ষার শেষে নীলারবাড়ি যাওয়ার কথা। কিন্তু তার সে রকম কোন চিন্তা ভাবনাই নেই।

সুন্দর চোখ সাজানো।

সন্ধ্যার ক্ষণে বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত নীলা। এমন সময় হঠাৎমােবাইল ফোন বেজে ওঠলাে। ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে পিতা শ্রীঘ্রবাড়ি যাওয়ার জন্য বললাে। নীলা উত্তরে বললাে, আগামী দিনআসবাে। তেমনি খুব সকালে রওনা হয়ে বাস যােগে পৌছালাে।

 

যােগেশ বাবুর মেয়ে স্নেহলতা ও নীলা সমবয়সি। একসাথে
পড়াশুনা করে। প্রায় সময় নীলা স্নেহলতার কাছে যেতাে। স্নেহলতাতার কাছে আসতাে। তাদের গভীর মিল ছিল। কারণে অকারণেএকসাথে সময় কাটাতে তাদের ভালাে লাগতাে।যােগেশ বাবুর পাশের বাড়ি হলেও বেশি দূরত্ব ছিল না। প্রায় পাঁচছয় হাতের মতাে এ-ঘর থেকে ও-ঘরের দূরত্ব।

 

স্নেহলতার দাদা নিরুপম পড়াশুনা শেষ করে বেকার বসে আছে।এতাে চাকরির পরীক্ষা দেয় কিন্তু কোন চাকরিই কপালে জোটে না।ঘরের লােকদের তাে আছেই, গ্রামের লােকদের কটুক্তির কোন শেষনেই। গ্রামের মাথায় সুরেশ কাকার দোকানে চা খেতে গিয়েছিল মাঘমাসের ঘন কুয়াশাময় শীতে গা-টা চাঙ্গা করার জন্য। কুড়ি টাকার
একখানা নােট মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল এজন্য। পিতাররাখতে দেওয়া মায়ের হাতে কয়েকশত টাকার মধ্যে একটি কুড়িটাকার নােটও ছিল। সেটাই নিরুপমের মা নিরুপমকে দিয়েছিল।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।

টাকাটা দেওয়ার সময় বলেছিল, এভাবে লুকিয়ে আর কত দিবাে।চাকরি তাে কপালে নেই, এবার অন্য কিছু করার চেষ্টা করাে। তুমিতাে গ্রামের দশ-পাঁচ জনের কথা শােনাে, সাথে তােমার পিতারও।আমিও এটা থেকে বাদ পড়ি না। তুমি কোন কিছু করে পারলেআমাকে উদ্ধার করাে। না হয় আমি মরে গিয়েও শান্তি পাবাে না।সবাই বলে তােমার বিয়ের সময়ও পার হয়ে যাচ্ছে। আমি মা হয়ে কিকরবাে। আমার করার কিছু নাই।

 

নীলা স্নানের পর চুল শুকাতে শুকাতে ছাদে ঘুরে বেড়াতাে।নিরুপমও সেই সময় বাসার নির্জন ছাদের চিলেকোঠার এক পাশেচাকরির জন্য বই নিয়ে বসতাে। পড়ার জন্য এরূপ স্থানই ঠিক ছিল,কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখলে বুঝতে দেরি হবে না যে, ব্যাঘাতও কমছিল না।

 

এ পর্যন্ত বিয়ে সম্বন্ধে কোনাে মেয়ের বাড়ি হইতে প্রস্তাব আসে
নি। অমল বাবুর দিক থেকে প্রস্তাব না আসার একটু কারণ ছিল। তবেএকটি ছেলে পড়াশুনা শেষ করে বিভিন্ন চাকরির পিছনে ছুটছে, 

 

কি কারি চাকরি করালক্ষ জনের মধ্যে হাজার জনের মধ্যে থাকা বিসিএসে পাশ করা সদ্যএ.এস.পি নৃপেনের দিকে অমল বাবুর নজর কাটছে না। মনে মনেঅমল বাবু ভাবছেন মেয়েকে এমন ছেলের হাতে দিতে পারলে জীবন
ধন্য হতাে।

 

নৃপেনের বাড়ির দূরত্ব ছিলনীলাদের বাড়ি থেকে তিন চার খানাবাড়ি রেখে। একদিন নৃপেনকে ডেকে পাঠালেন ছেলে নিখিলের দ্বারামিষ্টি মুখ ও চা পান করাতে, সদ্য পুলিশি বাবু হওয়াতে। সাথে সাথে মনেমনে মেয়ে দেওয়ার দারুণ ইচ্ছা। চায়ের টেবিলে অমল বাবু বসে অপেক্ষাকরছেন নৃপেনের জন্য। সন্ধ্যা সাতটা বাজে আসার কথা ছিল, কিন্তুনৃপেন এখনও আসছেনা। অমল বাবু রীতিমতাে অস্থির হয়ে উঠেছেন।সাতটা দাশ বাজতেই নৃপেন এসে হাজির। এসেই কাকাবাবুবাসায় আছেন বলে ডাক দিতেইঅমল বাবু, নীলার বাবা চমকে উঠেবললেন, হ্যা, বাবা নৃপেন এসেছাে? আমি তােমার জন্য অপেক্ষায়ছিলাম।

 

হৃদয়ে সূর্যাস্ত

 

অমল বাবু নীলার মাকে বড়গলায় জোরে বলতে লাগলেন, কইগােপারু, আমাদের বাড়িতে সদ্য পুলিশ খগেনের ছেলে নৃপেন আসছে।মিষ্টি নিয়ে আসাে।অমল বাবু নীলাকে ডাকা শুরু করলেন, মা নীলা এদিকে বেরিয়েআয়, বাবা নৃপেন আসছে।নীলার বড় ভাই নিখিলও রুম থেকে বেরিয়ে আসলাে তড়িঘড়িকরে। নৃপেন দাঁড়িয়ে আছে। নীলার মা পারু বললেন, কি গাে বাবানৃপেন দাঁড়িয়ে আছে যে; বসাে। অমনি নৃপেন বসে পড়লাে। সাথেএসে বসলাে নীলার ভাই নিখিল ও অমল বাবু।

 

এরমধ্যে নীলার মা পারু বালা ঘরের মধ্যে গিয়ে নীলাকে দিয়ে।রান্না ঘর থেকে মিষ্টি পাঠিয়ে দিলো। আর বললাে, তুমি মিষ্টি নিয়েযাও আমি চা নিয়ে আসছি।সবাই মিলে পুলিশি বাবু হওয়ার খােশ গল্প শুরু হলাে। নৃপেনেরআর বুঝতে বাকি ছিল না- এত কদর কেন। কারণ যে অমল বাবুনৃপেনের বাবা খগেনকে ভালাে-মন্দ জিজ্ঞেস করতাে না, চলার পথেদেখা হলে। কখনাে নৃপেনকে তেমন কুশল বিনিময় করতাে না, তবে খন কেন করছে।

 

অমল বাবু মিষ্টি খেতে খেতে বলে উঠলেন, বাবা দেখ দেখি,
তােমার কি কপাল, সরকারি চাকরি হয়ে গেল। আর আমাদের বাড়িরপাশে যােগেশ বাবুর ছেলে কি করলাে । টাকা পয়সা নষ্ট করে পড়াশুনাকরলাে কিন্তু চাকরি কপালে জোটেনি আজও।

 

পারু বালা তিক্ততার সাথে বলে উঠলেন, আহা, থামাে তাে!
তােমার ছেলে কি করেছে? সে কি কখনাে আমাকে চাকরির মুখপরের দিন সন্ধ্যায় দেখা করতে গিয়ে দেখে নৃপেন ঘাটলার উপর পাঝুলিয়ে বসে আছে। পিছন থেকে গিয়ে স্নেহলতা জড়িয়ে ধরলাে।নির্মল জ্যোৎস্না পুকুরে ঢেউ বিহিন, ঠিক অবলা, আদরে নিশ্ৰুপ হয়েআছে। নৃপেন অনেকক্ষণ স্নেহলতার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে।এই নিৰ্মীলিতন্ত্রের সুখখানি ছােট, তবুও এতবড় আকাশের মাঝখানে,

বিস্তীর্ণ জ্যোৎস্নায় কেবল এই সুন্দর কোমল মুখ একটি মাত্র দেখবারজিনিসের মতাে ফুটে আছে। নৃপেন সকল কথা ভুলে গেল,ভাবিল-একে দশ বছর আগে দেখে মনে রেখেছি তবে তার যে কলরবজানতাম না। সরকারি চাকরি পাওয়ার আগে তা দেখিনি ভালােইহয়েছে। এর পিছনে ছুটতে ছটতে আমার আর চাকরি পাওয়া হতাে

দু’পাঁজরে মধ্যে বন্ধি করে রাখল স্নেহলতাকে কয়েক মিনিটএবংএকটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লাে একসাথে দুজন। মনে হলাে এ যেন ঈশ্বরপ্রদত্ত ভালােবাসা।স্নেহলতা বলে উঠলাে, অনেক সময় হয়েছে, এই বার বাড়িতে নাগেলে ধরা পড়ে যাবাে।নৃপেন আচ্ছা বললাে- ঠিক আছে তুমি আস্তে আস্তে বাড়ির দিকেযাও। যত সময় না পর্যন্ত তুমি ঘরে উঠবা তত সময় আমি এখানেদাঁড়িয়ে থাকবাে। আমি কাল চলে যাবাে। থানা থেকে ফোন এসেছে।স্নেহলতার বুকের মধ্যে যেন দুমড়ে মুচড়ে গেল নৃপেনের চলে যাওয়ারকথা শােনার সাথে সাথে। অমনি স্নেহলতা হাতে হাত চেপে ধরে

 আবার কবে আসবা?

অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না তেমন। জোৎস্নায় আফছা দেখা যাচ্ছে।স্নেহলতার চোখ যেন ছলছল করছে। স্নেহলতার দু’ঠোটে নিজেরদু’ঠোট চেপে দিয়ে নৃপেন বললাে, খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবাে। তুমিএখন বাড়ি যাও। স্নেহলতা কিছু না বলে চলে গেলাে। নৃপেন নিশ্চপদাঁড়িয়ে রইলাে। পরক্ষণে নৃপেনও চলে গেল।

 

সকালে নৃপেন ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হলাে। যাওয়ার সময় বাবাকেবললাে, বাবা কিছু দিন পরে আসবাে। স্নেহলতাকে আমার পছন্দ।আর কিছু না বলে চলে গেল। খগেন বাবু বাকিটুকু বুঝে ফেললাে।ছেলে বড় চাকরি করে, খগেন বাবু এর পিরীতে কথা বলতে চাইলাে।

 

 জানা আছে মেয়ে শিক্ষিত সভ্য শান্ত। সে রাজি হয়ে গেল।
নৃপেনের মা কমলা দেবিকে জানালাে। সে সম্মতি দিলাে।রের দিন নৃপেনের বাবা যােগেশ বাবুর বাড়িতে গেল। বিয়েরপ্রস্তাব রাখল ছেলের জন্য। যােগেশ বাবু মহা খুশি। এমন প্রস্তাব কেহাতছাড়া কওে বলে নিরুপমের মাকে ডাকতে লাগলাে। চা আপ্যায়নশেষে দিন তারিখ ধার্য করার জন্য আলােচনা শুরু হলাে।

 

স্নেহলতা সম্মুখে উপস্থিত ছিল। সে বলে উঠলাে নির্ধিধায়, বাবারধার দেনা আছে। আমল বাবুর কাছে ঋণী। টাকা না দিতে পারলেনিখিলের মতাে খারাপ ছেলের সাথে আমার বিয়ে করতে হতে পারে।এ কথা অমল বাবু জানিয়েছেন। খগেন বাবু বলে উঠলাে, মা আমি ঋণপরিশােধ করে তােমাকে আমার পুত্রের জন্য নিয়া যাবে। আমারএকমাত্র সন্তান নৃপেন। যা চাইবে আমি তাই করবাে। তুমি নিশ্চিন্ত
থাকো।

 

এমন কথা শুনে যােগেশ বাবু বললাে, আত্মীয় হবেন নতুন।
একমাত্র ছেলে তা কি হয়। গাঁয়ের লােক কি বলবে? সারা জীবন কথাশুনতে হবে আমাদের আশপাশের লােক জনের। নৃপেন বড় পুলিশঅফিসার। তার শ্বশুর বাড়ির লােক বলে কথা। অমল বাবু বেশি কিছুকরতে পারবে না। সে ব্যবস্থা আমি করিবাে- একথা উঠে যেতে যেতেবললাে খগেন বাবু। এরপর দিন তারিখ ধার্য করার জন্য আগামী দিন

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.